মস্কোতে রুশ জেনারেলকে গুলি, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
মস্কোতে রুশ জেনারেলকে গুলি, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে আবারও এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সকালে একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রাশিয়ার জেনারেল স্টাফের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেনারেল ভ্লাদিমির আলেকসেয়েভ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে এটিকে রাশিয়ার শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো আরেকটি হত্যাচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাশিয়ার তদন্ত কমিটির দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অজ্ঞাত এক ব্যক্তি মস্কোর ওই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে জেনারেল আলেকসেয়েভকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছুড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। হামলার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী এলাকা ঘিরে ফেলে এবং আহত জেনারেলকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন বলে জানা গেছে।

তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলাকারীর পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানতে তদন্তমূলক ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ করা হয়নি। এই নীরবতা জল্পনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে ও বাইরে একাধিক লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের ওপর পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে রাশিয়ার একাধিক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড বা হামলার শিকার হয়েছেন। কিছু ঘটনায় ইউক্রেন সরাসরি দায় স্বীকার করেছে, আবার কিছু ঘটনায় কিয়েভ কোনো মন্তব্য করেনি। এসব হামলা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

জেনারেল ভ্লাদিমির আলেকসেয়েভ রাশিয়ার সামরিক কাঠামোর অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন কর্মকর্তা। অনলাইন জীবনী অনুযায়ী, তিনি রাশিয়ান জেনারেল স্টাফের প্রথম উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন পেশাগত সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি রাশিয়ার কৌশলগত ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

বিশেষ করে সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের সময় আলেকসেয়েভ গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন। সে সময় ক্ষমতাচ্যুত নেতা বাশার আল-আসাদকে সমর্থন দিতে রাশিয়ার সামরিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারে এই অভিযানের বড় ভূমিকা ছিল, আর আলেকসেয়েভ ছিলেন সেই পরিকল্পনার অন্যতম রূপকার।

এ ছাড়া ২০২৩ সালে ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের বিদ্রোহচেষ্টার সময়ও আলেকসেয়েভ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। সে সময় তাকে রাশিয়ার সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমঝোতার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। প্রিগোজিনের সেই বিদ্রোহচেষ্টা রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং এর পর থেকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হলেও হামলার ঘটনা থামেনি।

রাশিয়ার তদন্ত কমিটির মুখপাত্র স্বেতলানা পেট্রেনকো এক বিবৃতিতে বলেন, এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় সব তদন্তমূলক পদক্ষেপ ও অপারেশনাল অনুসন্ধান কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং কোনো দিকই উপেক্ষা করা হবে না।

এই হামলার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত মাসে রাশিয়ার একটি আদালত ২০২৪ সালে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর রেডিওলজিক্যাল, রাসায়নিক ও জৈবিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানকে হত্যার দায়ে একজন উজবেক নাগরিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। সেই মামলাটি রাশিয়াজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং বিদেশি জড়িত থাকার অভিযোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

এ ছাড়া এর আগেও মস্কোতে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। মস্কোর একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক থেকে বের হওয়ার সময় একটি বুবি-ফাঁদে আটকানো স্কুটার বিস্ফোরণে জেনারেল ইগর কিরিলোভ নিহত হন। ওই ঘটনার দায় কিয়েভ স্বীকার করেছিল। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় শুক্রবারের গুলির ঘটনা রাশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক হামলা কেবল সামরিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা একদিকে মনোবল দুর্বল করার কৌশল, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাশিয়ার ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ ধরনের হামলা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। রাজধানী মস্কোর মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত শহরে একজন জ্যেষ্ঠ জেনারেল গুলিবিদ্ধ হওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধের প্রভাব এখন আর শুধু ফ্রন্টলাইনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি রাজধানীর ভেতরেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে তদন্তের অগ্রগতি এবং রুশ কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে এটুকু স্পষ্ট, মস্কোতে জেনারেল আলেকসেয়েভকে গুলিবিদ্ধ করার ঘটনা রাশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত