কাশ্মীরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু: ভারতের প্রতি শাহবাজের বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
কাশ্মীরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু: ভারতের প্রতি শাহবাজের বার্তা

প্রকাশ:  ০৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কাশ্মীর প্রশ্নকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ‘কাশ্মীর সংহতি দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, কাশ্মীর একদিন পুরোপুরি পাকিস্তানের অঙ্গ হবে—এমন আশাই পাকিস্তানের জনগণ ও রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে তিনি ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জম্মু–কাশ্মীর বিরোধের স্থায়ী সমাধান চাইলে কাশ্মীরি জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

শাহবাজ শরিফের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পাকিস্তানে প্রতিবছর ৫ ফেব্রুয়ারি ‘কাশ্মীর সংহতি দিবস’ পালিত হয়। ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ জম্মু–কাশ্মীরের জনগণের তথাকথিত ‘মুক্তি আন্দোলনের’ প্রতি সংহতি জানাতে দিনটি পালনের সূচনা করেন। সময়ের পরিক্রমায় এই দিবস পাকিস্তানের জাতীয় ছুটিতে পরিণত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তা পালিত হয়ে আসছে। এবছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

কাশ্মীর সংহতি দিবস উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শরিফ বলেন, কাশ্মীর ইস্যু কেবল একটি ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়, এটি কাশ্মীরি জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। তাঁর ভাষায়, কাশ্মীরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির ভিত। তিনি দাবি করেন, এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো কাশ্মীরিদের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখা।

ভারত–নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীর প্রসঙ্গে শাহবাজ শরিফ তুলনামূলকভাবে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি অঞ্চলটিকে ফিলিস্তিনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যেমনভাবে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তেমনি কাশ্মীরিরাও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই তুলনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন নয়, তবে প্রতিবারই তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।

ভাষণে তিনি ভারত যেসব কাশ্মীরি নেতাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে, তাঁদের কয়েকজনের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেন। সৈয়দ আলী শাহ গিলানি, বুরহান ওয়ানি, ইয়াসিন মালিক, মিরওয়াইজ ওমর ফারুক এবং আসিয়া আন্দ্রাবিদের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব নেতা কাশ্মীরি জনগণের অধিকারের পক্ষে সংগ্রাম করেছেন এবং তাঁদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মতে, কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম পুরোপুরি ন্যায্য এবং শক্তি প্রয়োগ করে এই আন্দোলন দমন করা সম্ভব নয়।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি সরদার আসিফ আলী জারদারিও কাশ্মীর সংহতি দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় কাশ্মীরি জনগণের আন্দোলনের প্রতি তাঁর দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী কাশ্মীর সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখা।

এদিকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, কাশ্মীরি জনগণের সংগ্রামের প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরসহ সব বাহিনীর প্রধানের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। সেনাবাহিনীর এই অবস্থান পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই দাবি করা হয়।

অন্যদিকে, ভারতের অবস্থানও আগের মতোই কঠোর। নয়াদিল্লি প্রতিবছরই পাকিস্তানকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জম্মু–কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে বলে আসছেন, কাশ্মীর প্রশ্নে তৃতীয় পক্ষের কোনো ভূমিকার সুযোগ নেই এবং এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

তবে কাশ্মীর সংহতি দিবসে একটি ভিন্ন চিত্রও সামনে আসে। পাকিস্তান যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে কাশ্মীরিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছে, ঠিক তখনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী কাশ্মীরি জনগোষ্ঠীর একাংশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নামে। যুক্তরাজ্য, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানি দূতাবাসের সামনে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ইসলামাবাদ রাজনৈতিক স্বার্থে বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরে একটি ‘ছায়াযুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে, যার বলি হয়েছেন লক্ষাধিক কাশ্মীরি মানুষ।

বিক্ষোভকারীরা আরও দাবি করেন, পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মানবাধিকার পরিস্থিতিও প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁদের মতে, পাকিস্তান একদিকে ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি জনগণের অধিকারের কথা বললেও, অন্যদিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সেই অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব বিক্ষোভে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করার’ দাবিতেও স্লোগান ওঠে, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে পাকিস্তানের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শাহবাজ শরিফের বক্তব্য পাকিস্তানের ঐতিহ্যগত কাশ্মীর নীতিরই ধারাবাহিকতা। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাশ্মীর প্রশ্ন আগের মতোই অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আস্থাহীনতা, সীমান্তে উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

কাশ্মীর ইস্যুতে মানবিক দিকটি বারবার আলোচনায় এলেও বাস্তব সমাধানের পথ এখনও অস্পষ্ট। কাশ্মীরি জনগণের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক গভীর মানবিক সংকট হিসেবেই রয়ে গেছে। শাহবাজ শরিফের বক্তব্য সেই পুরনো ক্ষতকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে—যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি এবং মানুষের বেদনা একসূত্রে জড়িয়ে আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত