গাজায় মৃত্যু দুই লাখ ছাড়াতে পারে, সতর্ক জেনেভা একাডেমি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
গাজায় মৃত্যু দুই লাখ ছাড়াতে পারে, সতর্ক জেনেভা একাডেমি

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক বিপর্যয় নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেনেভা একাডেমি। সংস্থাটির প্রধান স্টুয়ার্ট কেসি ম্যাসলেন সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সংঘাত, অবরোধ ও মানবিক সহায়তার ঘাটতির ফলে গাজায় মৃত্যুর সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং গাজার বাস্তবতা নিয়ে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

আনাদোলু সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাসলেন বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গাজার জনসংখ্যা ইতোমধ্যে ১০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এই হ্রাস কেবল অভিবাসন বা বাস্তুচ্যুতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং এটি ব্যাপক প্রাণহানির দিকেই ইঙ্গিত করে। তার ভাষায়, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দুই লাখে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়।

স্টুয়ার্ট কেসি ম্যাসলেনের নেতৃত্বে জেনেভা একাডেমি সম্প্রতি ‘ওয়ার ওয়াচ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে গাজাসহ গত ১৮ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত ২৩টি সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে গাজার অবস্থা আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—এটি বর্তমান সময়ের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট। ম্যাসলেন নিজেই গাজার পরিস্থিতিকে ‘নাটকীয়’ ও ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় বর্তমানে গাজায় ভারী সামরিক সংঘর্ষের তীব্রতা কিছুটা কমেছে, যা আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংঘর্ষের মাত্রা কমে যাওয়া মানেই গাজার মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়ে গেছে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার সংকট গাজার পুরো জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশেষ করে আহত ও অসুস্থ মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জেনেভা একাডেমির এই প্রধান। তার মতে, হাজার হাজার আহত ব্যক্তি এমন অবস্থায় রয়েছেন, যাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু সীমান্ত বন্ধ, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং হাসপাতালগুলোর অচল অবস্থার কারণে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ম্যাসলেন বলেন, অনেক মানুষ সরাসরি যুদ্ধের গোলায় নয়, বরং চিকিৎসার অভাবে, সংক্রমণ ও অপুষ্টির কারণে মারা যাচ্ছেন।

গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বহু হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে গেছে বা আংশিকভাবে অকার্যকর। যেগুলো এখনো চালু আছে, সেগুলোতেও ওষুধ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকট। চিকিৎসক ও নার্সরা সীমিত উপকরণ নিয়ে অসীম চাপের মধ্যে কাজ করছেন। এই পরিস্থিতিতে গুরুতর আহতদের বাঁচিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ম্যাসলেন আরও বলেন, গাজার মানুষের জন্য এখন শুধু খাদ্য ও পানিই যথেষ্ট নয়। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন ব্যাপক মানবিক সহায়তা। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ আশ্রয়, শীতের কঠোর আবহাওয়া থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা। তিনি সতর্ক করে বলেন, শীতকাল, অপুষ্টি ও পানিবাহিত রোগ একসঙ্গে গাজার মানুষের জন্য নতুন মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে।

গাজার জনজীবনের বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্থায়ী আশ্রয়ে বাস করছে। অনেকের মাথার ওপর কোনো স্থায়ী ছাদ নেই। বৃষ্টি ও ঠান্ডায় শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে বিভিন্ন রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও গাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন ম্যাসলেন। তার মতে, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু গাজার ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তিনি বলেন, মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা, চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং বেসামরিক মানুষের জীবনঝুঁকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।

জেনেভা একাডেমির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গাজার সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই সংকটে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলেও একই ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়বে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ম্যাসলেনের এই সতর্কবার্তা মূলত বিশ্বনেতাদের প্রতি একটি জোরালো আহ্বান। গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি একটি পুরো প্রজন্ম শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতির শিকার হবে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গাজার পরিস্থিতি নিয়ে জনমত ও সংহতি বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে গাজার সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা যায়। তবে এখনো পর্যন্ত বাস্তব পরিবর্তন সীমিত হওয়ায় উদ্বেগ কাটছে না।

সব মিলিয়ে, জেনেভা একাডেমির এই সতর্কবার্তা গাজার বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। দুই লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি প্রতিটি পরিবারের ভাঙন, প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ হারানোর গল্প। গাজার মানুষের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে—এই বার্তাই যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দিতে চাইছেন স্টুয়ার্ট কেসি ম্যাসলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত