লালপুরে নির্বাচনী উত্তেজনা, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংঘর্ষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৮ বার
লালপুরে নির্বাচনী উত্তেজনা, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংঘর্ষ

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাটোরের লালপুর উপজেলায় ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেই বিএনপি প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সর্বশেষ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন এবং বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্পে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ, যাকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক বলে দাবি করা হচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে লালপুর উপজেলার আরবাব ইউনিয়নের কচুয়া বাজার এলাকায়। এলাকাবাসী ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়, রাতের বেলায় নির্বাচনী প্রচারণা ও মিছিলকে কেন্দ্র করে প্রথমে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

পুলিশ জানায়, আটক ব্যক্তির নাম খলিলুর রহমান। তিনি আরবাব ইউনিয়নের বড়বাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এ ঘটনার পরপরই খলিলুর রহমানের মুক্তির দাবিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপুর সমর্থকরা লালপুরে বিক্ষোভ করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এ বিষয়ে বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব হারুনুর রশিদ পাপ্পু অভিযোগ করে বলেন, এশার নামাজের পর আরবাব ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কচুয়া বাজারে তাঁদের নির্বাচনী অফিসে কয়েকজন নেতা-কর্মী বসে ছিলেন। সেই সময় সালামপুর এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপুর এক থেকে দেড়শ সমর্থক মিছিল নিয়ে কচুয়া বাজারে প্রবেশ করে। মিছিলটি একবার অফিসের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে আবার ঘুরে এসে উত্তেজনাকর স্লোগান দিতে থাকে।

হারুনুর রশিদ পাপ্পুর ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে ওই মিছিল থেকে বিএনপির নির্বাচনী অফিসে হামলা চালানো হয়। অফিসের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয় এবং বিএনপি প্রার্থী ফারজানা শারমিন পুতুল ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি ছিঁড়ে ফেলা হয়। এ সময় বিএনপির অন্তত তিনজন সমর্থক আহত হন। তিনি বলেন, “আমরা কোনো উসকানি দিইনি। পরিকল্পিতভাবেই আমাদের অফিসে হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনার পর আমরা আইনি ব্যবস্থা নিতে থানায় এসেছি।”

অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, তাঁর সমর্থকরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিলেন। সেই সময় বিএনপি সমর্থকরা তাঁদের ওপর হামলা চালায় এবং কয়েকজন আহত হয়। তাঁর দাবি, তাঁর সমর্থকরা কোনো ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না। বরং তাঁর লোকজনই আক্রমণের শিকার হয়েছে।

এই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাজারের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করেই বাজার এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যান। সংঘর্ষের সময় লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে কেউ কেউ দাবি করেছেন, যদিও এ বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, প্রাথমিকভাবে যতটুকু জানা গেছে, নাটোর-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, “স্থানীয় জনগণ একজন ব্যক্তিকে আটক করে রেখেছিল। পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। আটককৃত ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপুর সমর্থক বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নির্বাচন ঘিরে লালপুর এলাকায় এটি প্রথম সংঘর্ষ নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এর আগেও পোস্টার ছেঁড়া, মাইকিং বন্ধ করা এবং সমর্থকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডার অভিযোগ উঠেছে। তবে এবার সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একই দলের প্রার্থী ও বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে সংঘর্ষের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। লালপুরের ঘটনাতেও সেটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তারা বলছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, না হলে ছোট ঘটনা বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

এদিকে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আহ্বান জানানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন সব সময় দেখা যাচ্ছে না। লালপুরের মতো এলাকায় সহিংসতার খবর সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের ঘটনায় ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে।

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। তারা সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে লালপুরের এই সংঘর্ষ নির্বাচনী মাঠে উত্তেজনার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। একজন আটক হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সামনে নির্বাচন যত এগোবে, ততই প্রশাসনের ভূমিকা ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত