প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বা ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের সাম্প্রতিক প্রকাশিত নথি থেকে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য। কুখ্যাত বিলিয়নেয়ার জেফরি এপস্টেইন শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারের অভিযোগেই অভিযুক্ত ছিলেন না, বরং তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদার বসতি স্থাপন কার্যক্রমেও অর্থায়ন করেছিলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির বরাতে প্রকাশিত এসব তথ্য বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে বিচারাধীন অবস্থায় রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করা এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের দিয়ে যৌন পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ ছিল। তার মৃত্যুর পরও এপস্টেইনকে ঘিরে নানা নথি, ইমেইল ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে, যা তার প্রভাব, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আদর্শিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০০৫ সালে দাখিল করা এপস্টেইনের করসংক্রান্ত দলিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এবং ফিলিস্তিনি ভূমিতে অবস্থিত বিতর্কিত ইহুদি বসতিগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিলেন। এসব অনুদানের বিষয়টি এতদিন জনসমক্ষে আসেনি।
নথিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৫ সালের ৩ মার্চ জেফরি এপস্টেইন ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস’ নামের একটি সংগঠনে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দেন। এই সংগঠনটি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সহায়ক কার্যক্রমে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ রয়েছে, ফলে এমন একটি সংগঠনে এপস্টেইনের অনুদান নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এপস্টেইনের অনুদান এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই বছরে তিনি ‘জিউইশ ন্যাশনাল ফান্ড’-এ ১৫ হাজার ডলার প্রদান করেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন ও ভূমি অধিগ্রহণে এই সংস্থার ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করে আসছে যে, এই তহবিল ফিলিস্তিনি জনগণের ভূমি দখলে সহায়তা করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
এ ছাড়া করনথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব জিউইশ উইমেন’-এও ৫ হাজার ডলার অনুদান দেন। যদিও সংগঠনটি সামাজিক ও নারীকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে, তবে এপস্টেইনের অনুদান তালিকায় এর অন্তর্ভুক্তি তার রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলেছে।
নতুন প্রকাশিত নথিতে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত মতাদর্শ সম্পর্কিত কিছু তথ্যও সামনে এসেছে। ২০১২ সালের ২০ মে তারিখে পাঠানো একটি ইমেইলে তিনি দাবি করেন, ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিন কখনোই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বশীল ছিল না। ওই ইমেইলে এপস্টেইন লেখেন, ফিলিস্তিন কখনো একচেটিয়াভাবে আরবদের দেশ ছিল না এবং সপ্তম শতকে মুসলিম অভিযানের পর ধীরে ধীরে আরবি ভাষা সেখানে প্রাধান্য লাভ করে। তিনি আরও দাবি করেন, ইতিহাসে কখনো কোনো স্বাধীন আরব বা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না।
এই বক্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ঐতিহাসিক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে অস্বীকার করার এই মনোভাব এপস্টেইনের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।
নথিতে এপস্টেইনের মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনাবলি নিয়েও কিছু নতুন তথ্য যুক্ত হয়েছে। এফবিআইয়ের ২০১২ সালের ১২ আগস্টের একটি নথিতে একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এপস্টেইনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কিছু ঘটনার বিবরণ সংযুক্ত করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে এতে এপস্টেইনের মৃত্যু ঘিরে দীর্ঘদিনের রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব নতুন তথ্য এপস্টেইনের ব্যক্তিগত অপরাধের বাইরেও তার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে আলো ফেলছে। একই সঙ্গে এটি প্রশ্ন তুলছে—কীভাবে একজন অভিযুক্ত যৌন অপরাধী এত বড় অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন প্রভাবশালী সংগঠনে দান করতে সক্ষম ছিলেন এবং সেই অর্থের উৎস ও উদ্দেশ্য কী ছিল।
এপস্টেইনের অনুদান ও মতাদর্শ সংক্রান্ত এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এ ধরনের অর্থায়ন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের নথি প্রকাশের পর এপস্টেইন কেলেঙ্কারি যে এখনো শেষ হয়নি, বরং নতুন মাত্রা পাচ্ছে—তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববাসী এখনো অপেক্ষায় আছে, এপস্টেইনের আর্থিক নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ে আরও কী তথ্য সামনে আসে।