প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে আবারও বিতর্ক উসকে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত ভোট কারচুপি ও ভোট চুরির ঘটনা ঘটছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অনিয়মের কারণে বিশ্বের চোখে আমেরিকার নির্বাচনব্যবস্থা এখন আস্থাহীন ও উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন সংস্কারে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, গত রোববার দেওয়া ওই পোস্টে ট্রাম্প তথাকথিত ‘সেইভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তার মতে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা এবং জনগণের ভোটাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি রিপাবলিকান পার্টির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান এবং কংগ্রেসকে দ্রুত নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
ট্রাম্পের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকেই তিনি ধারাবাহিকভাবে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ করে আসছেন। যদিও সেই নির্বাচনে জো বাইডেনের বিজয়কে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত, নির্বাচন কমিশন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রশাসন বৈধ বলে ঘোষণা করেছিল, তবুও ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি। এবারের মন্তব্যে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে নির্বাচনব্যবস্থাকে ‘ভেঙে পড়া’ ও ‘অকার্যকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রস্তাবিত নতুন আইন কাঠামোর মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত তিনটি কঠোর নিয়ম কার্যকর করতে চান। তার প্রথম দাবি হলো, ভোট দেওয়ার সময় বাধ্যতামূলকভাবে সরকার-প্রদত্ত ভোটার পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে হবে। তার মতে, পরিচয় যাচাই ছাড়া ভোট গ্রহণ একটি রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে এবং এতে অবৈধ ভোটাররা সহজেই নির্বাচনী ব্যবস্থার সুযোগ নিতে পারে।
দ্বিতীয় দাবিতে তিনি ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সশরীরে উপস্থিত হয়ে মার্কিন নাগরিকত্বের প্রমাণ জমা দেওয়ার কথা বলেছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, বর্তমান ব্যবস্থায় অনলাইনে বা ডাকযোগে নিবন্ধনের সুযোগ থাকায় অবৈধ অভিবাসী কিংবা বিদেশি নাগরিকরা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কঠোর প্রক্রিয়া চালু না করলে প্রকৃত মার্কিন নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হবে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত প্রস্তাবটি হলো ডাকযোগে ভোট বা মেইল-ইন ব্যালট ব্যবস্থাকে প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। ট্রাম্প বলেছেন, শুধুমাত্র অসুস্থতা, গুরুতর শারীরিক অক্ষমতা, সামরিক বাহিনীতে কর্মরত থাকা কিংবা জরুরি ভ্রমণের মতো বিশেষ ক্ষেত্রে এই সুবিধা সীমিত আকারে রাখা যেতে পারে। তার দাবি, মেইল-ইন ব্যালট ব্যবস্থাই ভোট জালিয়াতির সবচেয়ে বড় উৎস।
তবে ট্রাম্পের এই প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং নাগরিক অধিকারকর্মীদের তীব্র আপত্তি রয়েছে। তাদের মতে, ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা এবং মেইল-ইন ব্যালট সীমিত করলে সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার খর্ব হবে। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিক, প্রতিবন্ধী ও দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য ভোট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তদন্তে দেখা গেছে, ভোট জালিয়াতির হার অত্যন্ত নগণ্য। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেন, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।
এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন চলতি বছরের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ইতোমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য ও সংস্কার প্রস্তাব রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে সমর্থন জোগাতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা, তবে একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য নিজস্ব নিয়মে নির্বাচন পরিচালনা করে, যা একদিকে স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও অন্যদিকে বিতর্কের জন্ম দেয়। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় কঠোর আইন সেই কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে ট্রাম্পের এই মন্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জন্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ। যাই হোক, আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে ট্রাম্পের এই অবস্থান যে মার্কিন রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।