নাগরিকত্ব পেতে আরও কড়াকড়ি নীতি নিচ্ছে সুইডেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪১ বার
সুইডেনে নাগরিকত্বের শর্ত কঠোর হচ্ছে

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউরোপের অন্যতম কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সুইডেনে নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত আরও কঠোর করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার। পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে আগামী ৬ জুন থেকে নতুন এই বিধান কার্যকর হবে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বসবাসের সময়সীমা, আয়ের যোগ্যতা, ভাষা ও সমাজজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই আগের তুলনায় কঠিন নিয়ম আরোপ করা হচ্ছে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, সুইডিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার আগে একজন আবেদনকারীকে দেশটিতে অন্তত আট বছর বৈধভাবে বসবাস করতে হবে। বর্তমানে এই সময়সীমা পাঁচ বছর। সরকারের মতে, দীর্ঘ সময় বসবাসের শর্ত নাগরিকত্বকে আরও দায়িত্বশীল ও অর্থবহ করে তুলবে এবং সমাজে একীভূত হওয়ার সুযোগ বাড়াবে।

শুধু বসবাসের সময়সীমাই নয়, নতুন নিয়মে আর্থিক সক্ষমতাকেও নাগরিকত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, আবেদনকারীর মাসিক আয় কমপক্ষে ২০ হাজার সুইডিশ ক্রোনার হতে হবে। এই শর্তের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া নাগরিকত্বপ্রত্যাশীদের সুইডিশ ভাষা, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আবেদনকারীরা সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মৌলিক ইতিহাস সম্পর্কে কতটা ধারণা রাখেন, তা যাচাই করা হবে। অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফোরসেল বলেন, কেউ যদি সুইডিশ নাগরিক হতে চান, তবে দেশটি রাজতন্ত্র না প্রজাতন্ত্র—এ ধরনের মৌলিক বিষয় জানা একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়েও নতুন নীতিতে আরও কঠোরতা আনা হচ্ছে। সুইডেনে বা বিদেশে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের জন্য অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কেউ যদি চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করে থাকেন, তবে তাকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে অন্তত ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে। সরকারের যুক্তি হলো, নাগরিকত্ব একটি অধিকার হলেও তা একই সঙ্গে দায়িত্বের বিষয়, আর গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সুইডেনে অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ার এই ধারা নতুন নয়। ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর থেকেই দেশটিতে অভিবাসন প্রশ্নে নীতিগত পরিবর্তন শুরু হয়। ওই বছর সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয়ের জন্য সুইডেনে আবেদন করেছিলেন। সেই সময় মানবিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে সুইডেন ব্যাপক প্রশংসা পেলেও পরবর্তী সময়ে আবাসন সংকট, কর্মসংস্থান, সামাজিক সংহতি এবং নিরাপত্তা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ সামনে আসে।

এরপর যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা ধাপে ধাপে অভিবাসন নীতি কঠোর করেছে। বর্তমান সংখ্যালঘু জোট সরকারও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই নাগরিকত্বের শর্তে পরিবর্তন আনতে চাইছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। সরকারের ধারণা, অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিলে আসন্ন সেপ্টেম্বরের সংসদীয় নির্বাচনে ভোটারদের সমর্থন পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফোরসেল সাংবাদিকদের বলেন, প্রস্তাবিত নতুন শর্তগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। তার ভাষায়, বর্তমানে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কার্যত খুব বেশি শর্ত নেই, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে সমন্বয় ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সমস্যার সৃষ্টি করছে। নতুন নীতির মাধ্যমে নাগরিকত্বকে আরও অর্থবহ ও মূল্যভিত্তিক করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে দেশটিতে বিতর্কও শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসী অধিকারকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কঠোর শর্তের কারণে অনেক অভিবাসী দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবেন। বিশেষ করে যারা নিম্ন আয়ের চাকরিতে যুক্ত অথবা ভাষা শিখতে সময় নিচ্ছেন, তাদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

অন্যদিকে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটস এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। দলটির দাবি, দীর্ঘদিনের ব্যর্থ অভিবাসন নীতির কারণেই দেশে গ্যাংভিত্তিক অপরাধ বেড়েছে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, নাগরিকত্বের শর্ত কঠোর না করলে সমাজে আইনশৃঙ্খলা ও সংহতি বজায় রাখা কঠিন হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সুইডেন এখন এক ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে দেশটি মানবিক মূল্যবোধ ও শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপও ক্রমেই বাড়ছে। নাগরিকত্বের নতুন এই শর্ত সেই দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন।

এর আগে গত সপ্তাহে সুইডেন সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও নিয়ম আরও কঠোর করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, ভর্তুকি সীমিত করা এবং প্রত্যাবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপের কথাও তখন আলোচনায় আসে। নাগরিকত্বের শর্ত পরিবর্তনের প্রস্তাব সেই বৃহত্তর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সুইডেনে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের অপেক্ষায় রয়েছেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সুইডেনের নাগরিকত্ব নীতিতে প্রস্তাবিত এই পরিবর্তন শুধু একটি আইনি সংস্কার নয়; এটি দেশটির সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সুইডেনের অভিবাসন নীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে, যার প্রভাব দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অনুভূত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত