বাঁশখালীতে বিএনপির দুর্গ ভাঙল কেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
বাঁশখালীতে বিএনপির দুর্গ ভাঙল কেন

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম–১৬, অর্থাৎ বাঁশখালী—দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে একটি প্রতীকী আসন হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রচলিত ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে এ আসন মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর ঘরেই থাকে। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি জয় পেয়েছিল এখানে। এমনকি ২০০৮ সালে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের বেশিরভাগে ভরাডুবির মধ্যেও বাঁশখালী ছিল তাদের দখলে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। এবার জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর প্রার্থী, যা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচনের বেসরকারি ফল অনুযায়ী, জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৯৬০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পেয়েছেন ৮২ হাজার ২৩৭ ভোট। এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী লেয়াকত আলী, যিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৭১ ভোট। ভোটের এই সমীকরণই পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

স্থানীয় নেতা–কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে চারটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রথমত, সাংগঠনিক দুর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকলেও এবারের নির্বাচনে দলীয় কাঠামোর সমন্বয়হীনতা ছিল দৃশ্যমান। তৃণমূলের অনেক কর্মী অভিযোগ করেছেন, প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে মাঠপর্যায়ে দলীয় সমন্বিত কর্মসূচি ছিল সীমিত। ভোটের দিন পর্যন্ত কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণে ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থীকে থামাতে না পারা। গন্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। স্থানীয়ভাবে তাঁর নিজস্ব প্রভাব ও সংগঠনিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর প্রাপ্ত ভোট বিএনপির মূল প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। বহু নেতা–কর্মীর মতে, এই ভোটের বড় অংশই বিএনপির ঘর থেকে এসেছে। ফলে ভোটের বিভাজন শেষ পর্যন্ত দলের জন্য আত্মঘাতী হয়েছে। অনেকেই স্বীকার করেছেন, লেয়াকত আলীকে ‘হালকাভাবে’ দেখা হয়েছিল; ধারণা করা হয়নি যে তিনি এত বড় প্রভাব ফেলতে পারবেন।

তৃতীয়ত, প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়ক হিসেবে এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া, যিনি ২০০৩ সালের সাধনপুরের ১১ জন সংখ্যালঘু পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি। ওই মামলাটি এখনো বিচারাধীন। স্থানীয়ভাবে এই বিষয়টি সংখ্যালঘু ভোটারসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নির্বাচনে ভাবমূর্তি একটি বড় উপাদান। বিতর্কিত অতীতের কাউকে সামনে আনা দলীয় ইমেজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

চতুর্থত, ত্যাগী নেতাদের দূরে সরিয়ে রাখা। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রার্থী নিজের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন, অথচ দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করা নেতাদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এতে সংগঠনের ভেতরে একধরনের নীরব অসন্তোষ তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে মাঠের কর্মসূচিতে। একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তাঁরা মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও পরবর্তী সমন্বয় নিয়ে হতাশ ছিলেন।

বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে। তাঁর পিতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও অতীতের বিজয়ের স্মৃতি দলীয় সমর্থকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে বর্তমানের জটিল নির্বাচনী বাস্তবতায় টিকে থাকা কঠিন। স্থানীয় ভোটারদের একটি অংশ মনে করেছেন, বাবার রাজনৈতিক ঐতিহ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক সংযোগ জোরদার করা প্রয়োজন ছিল।

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম আগে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। শেখেরখীল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি ও তাঁর দল ঘরে ঘরে গিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলীয় কোন্দল না থাকা এবং একক প্রার্থীর পক্ষে সমন্বিত প্রচারণা চালানো জামায়াতকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে দেয়।

বাঁশখালী ও সাতকানিয়া—চট্টগ্রামের এই দুই আসনে জামায়াতের জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সাতকানিয়ায় জয় প্রত্যাশিত ছিল বলে স্থানীয়দের ধারণা, তবে বাঁশখালীতে জয় এসেছে অনেকের জন্য অপ্রত্যাশিতভাবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এটি কেবল একটি আসনের ফল নয়; বরং তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন, প্রার্থী বাছাই ও কৌশলগত প্রচারণার গুরুত্বের উদাহরণ।

দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, ফল বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিতে হবে। তাঁরা বলছেন, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাব কাটিয়ে উঠতে না পারলে ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিও হাতছাড়া হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা এই ফলকে ধারাবাহিক সাংগঠনিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।

বাঁশখালীর সাধারণ ভোটারদের একটি অংশ বলছেন, তাঁরা উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যা সমাধান ও প্রতিনিধির সহজলভ্যতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও নিয়মিত উপস্থিতি ভোটের আচরণে বড় প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভোটাররা ক্লান্ত—এমন মন্তব্যও শোনা গেছে।

এই নির্বাচনের ফল তাই শুধু জয়–পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি দলগুলোর জন্য বার্তা। ঐতিহ্যগতভাবে ‘নিশ্চিত’ বলে ধরে নেওয়া আসনও যদি সাংগঠনিক শৈথিল্য, প্রার্থী নির্বাচনে অসন্তোষ ও ভোট বিভাজনের শিকার হয়, তবে ফল ভিন্ন হতে পারে। বাঁশখালীর অভিজ্ঞতা আগামী নির্বাচনের আগে বড় দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হয়ে থাকল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত