ইরান চাপে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৫ বার
ইরান চাপে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে আবারও শক্তির প্রদর্শন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরীগুলোর একটি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দেবে। তাঁর ভাষায়, ইরানকে একটি নতুন পরমাণু চুক্তিতে রাজি করাতে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ।

হোয়াইট হাউসে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, আগামী মার্চের মধ্যেই তেহরানকে একটি সমঝোতায় আসতে হবে। কূটনৈতিক পথ ব্যর্থ হলে সামরিক বিকল্প খোলা আছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তাঁর দাবি, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ অতীতের চেয়ে ‘আরও বিধ্বংসী’ হতে পারে। যদিও কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এই বক্তব্যের বড় অংশই চাপ তৈরির কৌশল, সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতির ঘোষণা নয়।

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড—যা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী হিসেবে পরিচিত। প্রায় এক লক্ষ টন ওজনের এই রণতরী একসঙ্গে বহু যুদ্ধবিমান বহন ও পরিচালনা করতে সক্ষম। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুইটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ একসঙ্গে মোতায়েনের অর্থ হলো আকাশ, সমুদ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় ধরনের শক্তি সঞ্চার।

এই সামরিক সমাবেশের পেছনে মূল ইস্যু ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সমঝোতা লঙ্ঘন করছে। ইরান অবশ্য দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। সাম্প্রতিক উপগ্রহচিত্রে ইরানের একটি পাহাড়ি স্থাপনার টানেল ও প্রবেশপথে নতুন করে কংক্রিট ঢালাই ও মাটি দিয়ে সুরক্ষা জোরদারের প্রমাণ মিলেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সম্ভাব্য বিমান হামলা ঠেকাতে এসব অবকাঠামো আরও মজবুত করা হচ্ছে।

গেল বছরের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্থাপনা ইরান মেরামত করেছে এবং আগের চেয়ে আরও গভীর ও সুরক্ষিত স্থানে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থা যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই দুই পক্ষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ছে।

এই উত্তেজনা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে। তারা আশঙ্কা করছে, দুই দেশের দ্বন্দ্ব বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিলে তেল সরবরাহ, বাণিজ্যপথ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি পরিবাহিত হয়। সেখানে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের দিক থেকেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত। সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ছবি লক্ষ্যচিহ্ন দিয়ে প্রচার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মালিকানাধীন ‘ওফোগ’ নেটওয়ার্কে প্রচারিত ওই তালিকাকে অনেকেই প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখছেন। এর জবাবে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়ে পাল্টা বার্তা দিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ধরনের প্রচার সরাসরি সামরিক সংঘাত না হলেও উত্তেজনার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলের ত্রিমুখী টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। তবে এবার পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে কারণ একই সময়ে কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনও বাড়ানো হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ নয়; বরং এমন এক চুক্তি, যাতে ইরানের পরমাণু কার্যক্রমে কঠোর সীমা আরোপ করা যায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ জোরদার হয়। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের কঠোরতা ও সামরিক প্রস্তুতির গতি দেখে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, আলোচনার পথ সংকুচিত হয়ে আসছে।

অন্যদিকে তেহরান প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় আসে, তবেই অগ্রগতি সম্ভব। কিন্তু সামরিক হুমকি দিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যাবে না।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দিকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের কূটনীতিকেরা উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, সামরিক সমাবেশ ও পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ এই উত্তেজনার মাঝেই দিন কাটাচ্ছেন। তেলবাজারের অনিশ্চয়তা, সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যুদ্ধের স্মৃতি এখনো তাজা—ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় শক্তির দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বেশি ভোগে সাধারণ মানুষই।

সামনের কয়েক সপ্তাহ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্চের সময়সীমা যত এগিয়ে আসবে, কূটনৈতিক তৎপরতা তত বাড়বে—নাকি সামরিক প্রস্তুতি আরও তীব্র হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন। বিশ্বের নজর এখন পারস্য উপসাগরের দিকে, যেখানে শক্তির ভারসাম্য ও কূটনীতির সূক্ষ্ম সমীকরণ নির্ধারণ করবে পরবর্তী অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত