প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনে লড়েছেন ৯ নারী প্রার্থী। তাদের মধ্যে চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। তবে ভোটের লড়াইয়ে প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি; সকলেই জামানত হারিয়েছেন। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৮৭৬ এবং সর্বনিম্ন পেয়েছেন মাত্র ১৫৩ ভোট।
রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রিটা রহমান সূর্যমুখী প্রতীকে ৪৬১ ভোট পেয়েছেন। একই আসনে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী ঈগল প্রতীকে ভোট প্রচার চালালেও চার দিন আগে তিনি সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে ব্যালটে নাম থাকায় তিনি ২৩৯ ভোট পান। রংপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী প্রগতি বর্মণ তমা কাঁচি প্রতীকে ২৪৩ ভোট অর্জন করেন। রংপুর-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী সূর্যমুখী প্রতীকে ১৫৩ ভোট পান।
ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূরুন নাহার বেগম লাঙ্গল প্রতীকে ২ হাজার ৮৭৬ ভোট পেয়ে নারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট অর্জন করেছেন। একই জেলার ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি ফুটবল প্রতীকে ২৭৯ ভোট পান। গাইবান্ধা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালমা আক্তার কলস প্রতীকে ৩৭৮ ভোট অর্জন করেন। গাইবান্ধা-৫ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী রাহেলা খাতুন কাঁচি প্রতীকে ২৪৯ ভোট পান। দিনাজপুর-৩ আসনে বাসদের কিবরিয়া হোসেন মই ২৮৩ ভোট এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের লায়লা তুল রীমা হারিকেন প্রতীকে ২১৪ ভোট পান।
পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় কোনো নারী প্রার্থী ছিলেন না। নির্বাচনের আগে এসব জেলায় কয়েকজন নারী প্রার্থী আগ্রহ প্রকাশ ও প্রচার চালিয়েছিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত মনোনয়ন পাননি।
নারী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় মনোনয়ন পেতে গিয়ে বড় বাধা হিসেবে থাকে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সাংগঠনিক প্রভাব। মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়তা ও কার্যক্রম থাকলেও মনোনয়ন বোর্ডে নাম উঠেনা। ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। তবুও কোনো বড় রাজনৈতিক দল এই বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারেনি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাবে অধিকাংশ দল একমত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে সেই লক্ষ্য রাখার সনদ চূড়ান্ত করা হলেও বাস্তবে দলগুলো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। বিএনপি মোট প্রার্থীর মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনে নারী প্রার্থী দেয়নি।
ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি বলেন, “কোনো দলই নারীদের যথাযথ মূল্যায়ন করে না। তাই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি।” তিনি মনে করেন, নারীদের ভোটের মাঠে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কেবল মৌখিক উৎসাহ বা প্রতীকী মনোনয়ন যথেষ্ট নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন বলেন, “তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্ব বিকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তি ও আর্থ-সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। নারীদের অংশগ্রহণকে আর ‘সহানুভূতি’ বা ‘অগ্রাধিকার’ হিসেবে নয়, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।”
মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দেশের প্রতিটি আন্দোলনে নারীরা সম্মুখসারিতে ছিলেন। কিন্তু ভোটের মাঠে সেই উপস্থিতি প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর নীতিগত ও সাংগঠনিক সংস্কার, প্রতীকী অংশগ্রহণ নয়।
নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ বাড়াতে দলগুলোকে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। নারীদের তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং রাজনৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।