চা বাগানের নারীরা এখনও বঞ্চিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৩ বার
চা বাগানের নারী শ্রমিক

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সবুজ পাহাড় আর চা–বাগানের সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সিলেট অঞ্চলকে অনেকেই ভালোবেসে বলেন ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ির দেশ’। কিন্তু এই নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কঠিন বাস্তবতা, যেখানে শতবর্ষী চা শিল্পের মেরুদণ্ড হয়ে কাজ করা নারী শ্রমিকদের জীবন এখনও দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বঞ্চনার ঘেরাটোপে আটকে আছে। চা শিল্পের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অবদান যতই বাড়ুক, শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন সেই তুলনায় হয়নি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

চা বাগানের ভোর শুরু হয় নারীদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম দিয়ে। সূর্য ওঠার আগেই ঘুম ভাঙে তাদের। পরিবারের জন্য রান্না, শিশুদের দেখাশোনা, পানি সংগ্রহসহ ঘরের কাজ শেষ করে তারা সকালেই দলবেঁধে বাগানে যান। দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থেকে চা পাতা তুলতে হয়, রোদ, বৃষ্টি বা শীত—কোনো কিছুই তাদের কাজ থামাতে পারে না। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় হাতে থাকে মাত্র কয়েকটি নোট, যা দিয়ে সংসারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা কঠিন। স্থানীয় শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দৈনিক মজুরি এতটাই কম যে তা দিয়ে বাজারের নিত্যপণ্যের দাম মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চা শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের ন্যায্য মজুরি নিয়ে বহু বছর ধরেই দাবি জানানো হলেও বাস্তবে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ৩২ টাকা। ২০০৯ সালে তা বাড়িয়ে ৪৮ টাকা করা হয়, পরে ২০১৩ সালে দাঁড়ায় ৬৯ টাকায়। বর্তমানে মজুরি কিছুটা বাড়লেও শ্রমিকদের দাবি প্রতিদিন অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দেওয়া হোক, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে সেই দাবির বাস্তবায়ন এখনও অনেক দূরের পথ।

চা বাগানের নারী শ্রমিকদের জীবন শুধু অর্থনৈতিক সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক ও মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ বাসস্থান ও স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল। ফলে তাদের সন্তানরাও একই দারিদ্র্যচক্রে আটকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার কম এবং সচেতনতার অভাবও বেশি, যা তাদের অধিকার আদায়ের পথে বড় বাধা।

নবীগঞ্জ এলাকার এক চা বাগানে কাজ করা ৪০ বছর বয়সী অনিকা রানির গল্প যেন হাজারো নারী শ্রমিকের প্রতিচ্ছবি। জন্মের পর থেকেই বাগানের শ্রমিক কলোনিতে বড় হয়েছেন তিনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে কাজ শুরু করেন, কারণ সংসারের অভাব তাকে স্কুলের বই ছেড়ে ঝুড়ি হাতে নিতে বাধ্য করেছিল। তার মা–ও ছিলেন চা শ্রমিক। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি চা পাতা তুলেও তার আয় সীমিত। নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে না পারলে সেই আয় আরও কমে যায়। সংসারে ছয়জন সদস্যের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অনিকা বলেন, বর্তমান আয় দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

অনিকার মতো নারী শ্রমিকদের দিনের খাবারও অনেক সময় অনিরাপদ ও অপর্যাপ্ত। সকালে লাল চা ও শুকনো রুটি খেয়ে তারা কাজে যান। দুপুরে বাগানের ভেতর বসে যে খাবার খান, তা সাধারণত সামান্য মুড়ি, আলু বা কাঁচা মরিচের মতো সহজলভ্য খাবার। পুষ্টিকর খাবারের অভাবে অনেকেই অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন। স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা সীমিত হওয়ায় অসুস্থ হলেও অনেক সময় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না।

শ্রমিকদের দাবি, দেশে যখন উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা ও সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে, তখন চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য তেমন কোনো বিশেষ সুযোগ নেই। ফলে তাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যচক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়, ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটছে। এক বাগান ব্যবস্থাপক জানান, নতুন স্থাপিত বাগানগুলোতে স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে শ্রমিকদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আসবে না।

চা শিল্প বাংলাদেশ–এর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে নীতিনির্ধারকদের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা সম্প্রসারণ এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনা গেলে এই খাতের উৎপাদনশীলতাও বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চায়ের মান ও সুনাম বজায় রাখতেও শ্রমিক কল্যাণ অপরিহার্য।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, চা বাগানের নারী শ্রমিকরা দ্বৈত বৈষম্যের শিকার—একদিকে দরিদ্র শ্রমিক হিসেবে, অন্যদিকে নারী হিসেবে। তারা বলেন, নারীদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে এই জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা যে বঞ্চনার মধ্যে বাস করছেন, তা দূর করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

সবুজ পাহাড়ের কোলে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, নতুন কুঁড়ি গজায়, চায়ের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। কিন্তু সেই কুঁড়ি তোলার হাতগুলো আজও ক্লান্ত, অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত। চা শিল্পের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে যত পরিকল্পনাই হোক, সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবে টেকসই হবে তখনই, যখন শ্রমিকদের জীবনেও আলো পৌঁছাবে। ততদিন পর্যন্ত সিলেটের চা বাগানের নারীদের গল্প থাকবে সংগ্রাম, সহনশীলতা ও অপ্রাপ্তির এক দীর্ঘ ইতিহাস হয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত