শহীদ মিনারে প্রধান বিচারপতির শ্রদ্ধা, নীরবতা ও স্মরণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
শহীদ মিনারে প্রধান বিচারপতির শ্রদ্ধা, নীরবতা ও স্মরণ

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মহান অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাঙালির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আত্মত্যাগ করা শহীদদের স্মরণে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি প্রভাতেই জাতি গভীর শ্রদ্ধায় নত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের একুশের প্রভাতেও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। শনিবার ভোরের নীরব ও আবেগঘন পরিবেশে তিনি রাজধানীর জাতীয় শহীদ মিনার-এ পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি গভীর সম্মান জানান।

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত শহীদ মিনারে পৌঁছান প্রধান বিচারপতি। তখনও চারপাশে ছিল প্রভাতের নরম আলো, আর বাতাসে ভেসে আসছিল একুশের আবেগমাখা সুর। শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা। তাদের নীরবতা যেন ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আত্মত্যাগের প্রতি সম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এর আগে একুশের প্রথম প্রহরেই শহীদ মিনার এলাকায় শুরু হয় রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। রাষ্ট্রপতির পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় শহীদ মিনার এলাকায় মাইকে বাজছিল একুশের অমর সংগীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। গানটির সুর যেন উপস্থিত সবার হৃদয়ে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি নতুন করে জাগিয়ে তোলে। প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণের পর কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

এরপর প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে এবং পরে রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে দলের নেতাদের সঙ্গে আবারও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরাও। পরে ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের এই ধারাবাহিকতায় অংশ নেন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর প্রধানরা পর্যায়ক্রমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তাদের উপস্থিতি জাতির পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরে বিরোধীদলীয় নেতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং কূটনীতিকরাও শহীদ মিনারে এসে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানান। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই অংশগ্রহণ ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব এবং এর বৈশ্বিক স্বীকৃতির প্রতিফলন।

একুশের এই গুরুত্বপূর্ণ দিনকে কেন্দ্র করে শহীদ মিনার এলাকায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। পুরো এলাকা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারিতে রাখা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত ইউনিট, ডগ স্কোয়াড এবং বোম্ব ডিসপোজাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়। পাশাপাশি শহীদ মিনারে আগত মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে ভোর থেকেই। শিশু থেকে বৃদ্ধ, ছাত্র থেকে শিক্ষক, শ্রমিক থেকে পেশাজীবী—সবাই ফুল হাতে এসে দাঁড়ান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, অনেকের মুখে ছিল গর্বের হাসি। এই দিনটি বাঙালির কাছে শুধু একটি দিবস নয়, বরং এটি তার আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বাঙালির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ‘উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে ছাত্রসমাজ। সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের ফলে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে এবং বাঙালি জাতি তার ভাষাগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

ভাষা আন্দোলনের এই ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষা এবং ভাষা আন্দোলন বিশ্বব্যাপী একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রধান বিচারপতির শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন এই বার্তাই বহন করে যে, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে অধিকার অর্জিত হয়েছে, তা রক্ষা করা এবং ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

একুশের প্রভাত তাই শুধু একটি স্মৃতিচারণ নয়, এটি একটি অঙ্গীকারের দিন। এটি সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেদিন বাঙালি তার ভাষার জন্য জীবন দিতে দ্বিধা করেনি। প্রধান বিচারপতির নীরব শ্রদ্ধা, রাষ্ট্রীয় নেতাদের উপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে অমর একুশে আবারও প্রমাণ করল, ভাষা শহীদদের স্মৃতি বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত