প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত দুই শক্তিধর দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডনাল্ড ট্রাম্প আগামী ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি সফরে চীনে যাচ্ছেন। হোয়াইট হাউজ আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্পের এই সফর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা কমিয়ে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতেই এই সফর আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
ট্রাম্প নিজেও সফরটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই সফর “মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ” হতে যাচ্ছে এবং এটি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। তার এই মন্তব্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৭ সালের পর এটি হবে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম সরকারি বেইজিং সফর। ফলে প্রায় এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব আবার সরাসরি চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। সফরটি অনুষ্ঠিত হবে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে, যেখানে দুই দেশের মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে বাণিজ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুল্ক আরোপ এবং পাল্টা শুল্ক আরোপ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, যা পরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়। এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর নতুন করে প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সয়াবিন রপ্তানি, প্রযুক্তি খাত এবং শিল্পপণ্যের বাজার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। একসময় চীন ছিল মার্কিন সয়াবিনের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। কিন্তু বাণিজ্য বিরোধের কারণে এই খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ফলে ট্রাম্পের সফরে এই বিষয়টি আবার আলোচনায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া সফরটি এমন সময় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন চীন করোনা মহামারির দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর আবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে। করোনা পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্প তখন প্রকাশ্যে ভাইরাসটিকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই সফরকে অনেকেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চীন সফর করেছেন এবং নতুন বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং বিভিন্ন দেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সফর শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তিধর দেশ। তাদের সম্পর্কের উন্নতি বা অবনতি পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে ট্রাম্প তার পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিক তুলে ধরতে চাইবেন। বিশেষ করে তিনি তার সমর্থকদের কাছে প্রমাণ করতে চাইবেন যে, তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্যদিকে, চীনের জন্যও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য কৌশলগতভাবে জরুরি।
এই সফরের ফলাফল কী হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটি নিশ্চিত যে, ট্রাম্পের এই সফর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেবে এবং বিশ্ব রাজনীতির গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বের নজর এখন বেইজিংয়ের দিকে, যেখানে দুই পরাশক্তির নেতা মুখোমুখি বসে ভবিষ্যতের সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণ করবেন। এই বৈঠক শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে।