বিলুপ্তির পথে রাজশাহীর শখের হাঁড়ি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৫ বার
রাজশাহীর শখের হাঁড়ি

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহীর মাটিতে একসময় যে শিল্পের রঙিন ছটা মেলায় মেলায় দর্শক টানত, সেই শখের হাঁড়ি আজ টিকে থাকার লড়াই লড়ছে। গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের পাল বংশের উত্তরসূরি সুশান্ত কুমার পাল শতবর্ষের ঐতিহ্য কাঁধে নিয়ে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন, তবু চারপাশে অনিশ্চয়তার ঘন কুয়াশা। বাহারি রঙ, সূক্ষ্ম নকশা, নিখুঁত কারুকাজে তৈরি পোড়ামাটির এই হাঁড়ি একসময় দেশজুড়ে সমাদৃত ছিল। এখন সেই শিল্প প্রায় নিভু নিভু প্রদীপ।

শৈশবে বাবার পাশে বসেই কাদা ছুঁয়ে প্রথম স্বপ্ন বুনেছিলেন সুশান্ত। তাঁর বাবা ভোলানাথ পাল চাইতেন তাঁদের শিল্প একদিন বিশ্বদরবারে জায়গা পাক। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন তিনি। ফলও মিলেছে। আঠারোটি দক্ষ কারিগর পুরস্কার, চারটি শ্রেষ্ঠ কারুশিল্প সম্মাননা, একটি স্বর্ণপদক এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। জয়নুল আবেদিন-এর নামে প্রাপ্ত সম্মাননা তাঁর জীবনের গর্বের মুকুট।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি তাঁর ঘর ভরিয়েছে সনদপত্রে। বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন, জাতীয় জাদুঘরসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সম্মাননা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। শখের হাঁড়ির গল্প স্থান পেয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়েও। দেশের বাইরে জাপানে গিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কারুশিল্প প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। তবু পদকের ঝলকানি সংসারের অভাব ঘোচাতে পারেনি।

সুশান্তের কণ্ঠে আক্ষেপ মেশানো দৃঢ়তা। তিনি বলেন, নাম পেয়েছি, সম্মান পেয়েছি, কিন্তু সচ্ছলতা পাইনি। বৈশাখী মেলা, বাণিজ্য মেলা, রথের মেলা কিংবা কুটির শিল্প মেলা ছিল তাঁর পণ্যের প্রধান বিক্রির ক্ষেত্র। রাজশাহীতে চাহিদা কম থাকলেও ঢাকার বড় মেলাগুলোতে ভালো বিক্রি হতো। করোনা মহামারির পর দীর্ঘ সময় মেলা বন্ধ থাকায় বিক্রি প্রায় থেমে যায়। দুই বছর ধরে স্টল ভাড়া বকেয়া থেকেছে। ঘরে তৈরি অসংখ্য হাঁড়ি জমে আছে, ক্রেতা নেই।

পোড়ামাটির শিল্প একসময় রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে ছিল। স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী সাড়ে চার হাজারের বেশি কারিগর এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। এখন হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশই পেশা বদলেছেন। প্লাস্টিক ও স্টিলের সহজলভ্য পণ্য বাজার দখল করেছে। মাটির হাঁড়ি, কলসি, বদনা, গুড়ের হাঁড়ি কিংবা মুড়ির হাঁড়ির জায়গা সংকুচিত হয়েছে দ্রুত। ঐতিহ্যবাহী শখের হাঁড়িও সেই চাপে টিকে থাকতে পারছে না।

সুশান্ত অভিযোগ করেন, প্রকৃত কারুশিল্পীরা অবহেলিত। অনেক সময় কারুশিল্পীর নামে স্টল নিয়ে অন্য পণ্য বিক্রি করা হয়। ফলে আসল শিল্পীরা ন্যায্য সুযোগ পান না। তিনি মনে করেন, সঠিক নীতিমালা ও তদারকি থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।

শখের হাঁড়ির উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন রাজশাহী বিসিকের নকশাবিদ আলাউদ্দিন। তাঁর উদ্যোগে ঢাকার বিজয় সরণির এক মেলায় প্রদর্শনী ও বিক্রির সুযোগ পেয়ে পণ্যটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পরে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর, লোক কারুশিল্প জাদুঘর, চারুকলা বিভাগ, বাংলা একাডেমি ও চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের মেলাগুলোতেও অংশ নেন সুশান্ত। সেই সময় গ্রামবাংলার মাটির শিল্প রাজধানীর সাংস্কৃতিক পরিসরে জায়গা করে নেয়।

দেশের গণ্ডি পেরিয়েও শখের হাঁড়ি পৌঁছেছে বিদেশে। জাপানে প্রবাসী বাঙালিদের এক আয়োজনে নৈপুণ্যখচিত সেরা নকশি হাঁড়ির স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। বিদেশি দর্শনার্থীরা বিস্মিত হয়েছেন রঙের ব্যবহার ও নকশার সূক্ষ্মতায়। তবু আন্তর্জাতিক প্রশংসা স্থানীয় বাজারের অভাব পূরণ করতে পারেনি।

পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ স্পষ্ট। দুই ছেলে সঞ্জয় ও মৃত্যুঞ্জয়, মেয়ে সুচিত্রা এবং পুত্রবধূদের এই শিল্পে দক্ষ করে তুলেছেন তিনি। তবু নিশ্চিত আয় না থাকায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহ টেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তরুণেরা অন্য পেশায় ঝুঁকছে। ফলে শতবর্ষের উত্তরাধিকার ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প টিকিয়ে রাখতে আধুনিক বিপণন কৌশল জরুরি। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, রপ্তানি সহায়তা, ডিজাইন উদ্ভাবন এবং পর্যটনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করলে নতুন বাজার সৃষ্টি হতে পারে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ ঋণ সুবিধা পেলে কারিগররা উৎপাদন বাড়াতে পারবেন। একই সঙ্গে কারুশিল্পীদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমে।

সুশান্তের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে রাজশাহীর শখের হাঁড়ি আবারও দেশ-বিদেশে সমাদৃত হবে। তিনি চান প্রশাসন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিক। ঐতিহ্য বাঁচানো মানে কেবল একটি পণ্য রক্ষা নয়, বরং এক গ্রামের ইতিহাস, শ্রম আর শিল্পসত্তা রক্ষা করা।

বসন্তপুর গ্রামের মাটির ঘ্রাণে এখনও রঙিন হাঁড়ির ছাপ লেগে আছে। চাকার ঘূর্ণনে তৈরি প্রতিটি হাঁড়ি যেন সময়ের সাক্ষ্য বহন করে। প্রশ্ন একটাই—এই ঘূর্ণন কি থেমে যাবে, নাকি নতুন প্রজন্মের হাতে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে রাজশাহীর শখের হাঁড়ি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত