এল মেনচো নিহত, সহিংসতায় কাঁপছে মেক্সিকো

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ বার
এল মেনচো নিহত, সহিংসতায় কাঁপছে মেক্সিকো

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মেক্সিকোর অপরাধ জগতের এক ভয়ংকর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটির কুখ্যাত মাদক সম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন, সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। তবে তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর পুরো দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক সহিংসতা, প্রতিশোধ এবং আতঙ্কের নতুন এক অধ্যায়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম BBC এবং বার্তা সংস্থা Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার ভোরে পশ্চিমাঞ্চলীয় জালিস্কো অঙ্গরাজ্যে একটি বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনী। অভিযানের সময় গুরুতর আহত হন এল মেনচো। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও পথেই তার মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছে মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

এল মেনচো ছিলেন মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী ও ভয়ংকর অপরাধচক্র জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল-এর প্রধান। এই কার্টেল শুধু মেক্সিকো নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাদক পাচার, অস্ত্র ব্যবসা এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত ছিল। বিশেষ করে সিনথেটিক ওপিওইড ফেন্টানিল উৎপাদন ও পাচারে তাদের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ ছিল।

তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেক্সিকোর বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় তাণ্ডব। কার্টেলের সমর্থকরা একযোগে বিভিন্ন শহরে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, সড়ক অবরোধ করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, অন্তত আটটি অঙ্গরাজ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বহু স্থানে গোলাগুলি, বিস্ফোরণ এবং আগুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

এই সহিংসতা শুধু অপরাধীদের প্রতিশোধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ার একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, এল মেনচো ছিলেন এমন একজন নেতা, যার নেতৃত্বে কার্টেলটি সামরিক সংগঠনের মতো কাঠামো গড়ে তুলেছিল।

এই অভিযানের পেছনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে। মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, মাদকবিরোধী এই অভিযানে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ছিল।

বিশেষ করে ফেন্টানিল সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মেক্সিকোর ওপর চাপ দিয়ে আসছিল। কারণ, এই মাদক যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। ফলে এল মেনচোকে গ্রেপ্তার বা হত্যার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল একটি বড় অগ্রাধিকার।

এল মেনচোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ অপরাধীতে পরিণত করে। তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার, হত্যা, অপহরণ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অসংখ্য অভিযোগ ছিল।

এদিকে মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম এর সরকার এমন এক সময় এই অভিযান চালাল, যখন তিনি দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ছিলেন। তার প্রশাসন শুরু থেকেই মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছিল।

এল মেনচোর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি এতটাই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করে। তারা জালিস্কো, তামাউলিপাস, মিচোয়াকান, গুয়েরেরো এবং নুয়েভো লেওনসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেয়।

শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দেয়। Air Canada, United Airlines, Aeromexico এবং American Airlines সহ কয়েকটি বড় এয়ারলাইন্স সহিংসতাপ্রবণ অঞ্চলে তাদের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

সাধারণ মানুষের জীবনেও এর প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে। বহু শহরে দোকানপাট বন্ধ, রাস্তাঘাট ফাঁকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক পরিবার ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, আগুনে জ্বলছে গাড়ি, রাস্তায় পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষ এবং দূরে শোনা যাচ্ছে গুলির শব্দ।

বিশ্লেষকদের মতে, এল মেনচোর মৃত্যু একদিকে যেমন মাদকবিরোধী লড়াইয়ে একটি বড় সাফল্য, অন্যদিকে এটি নতুন সহিংসতার ঝুঁকিও তৈরি করেছে। কারণ, তার অনুপস্থিতিতে কার্টেলের নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কার্টেলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হতে পারে।

মেক্সিকোর ইতিহাসে এর আগেও দেখা গেছে, কোনো বড় মাদক সম্রাট নিহত বা গ্রেপ্তার হওয়ার পর সহিংসতা সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। কারণ, অপরাধচক্রগুলো তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

এল মেনচোর জীবনও ছিল নাটকীয়। একসময় তিনি সাধারণ পুলিশ সদস্য ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর মাদক কার্টেলের নেতা হয়ে ওঠেন। তার উত্থান এবং পতন মেক্সিকোর অপরাধ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

বর্তমানে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে মেক্সিকোর দিকে। এল মেনচোর মৃত্যুর পর দেশটি কি স্থিতিশীলতার পথে এগোবে, নাকি নতুন করে সহিংসতার চক্রে আটকে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এল মেনচোর মৃত্যু শুধু একজন অপরাধীর সমাপ্তি নয়, বরং একটি যুগের অবসান। কিন্তু সেই যুগের ছায়া এখনো মেক্সিকোর আকাশে ঘন হয়ে আছে, আর সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করছে শান্তির ভোরের জন্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত