প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সর্বাত্মক হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশ্লেষকদের বড় অংশের দাবি, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে ইসরাইল, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অপরদিকে, দীর্ঘমেয়াদে এর রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য চুকাতে হতে পারে ওয়াশিংটনকেই।
গত বছর মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়ে ট্রাম্প আঞ্চলিক নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার প্রশাসন এই অঞ্চলে ‘জাতি-নির্মাণ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। পূর্বসূরি প্রশাসনগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, তথাকথিত হস্তক্ষেপকারীরা জটিল সমাজকে না বুঝেই সেখানে প্রবেশ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে এনেছে। কিন্তু সেই ঘোষণার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইরানে ‘স্বাধীনতা’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য দেখিয়ে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত তার ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Center for International Policy-এর সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম Al Jazeera-কে বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ‘পছন্দের যুদ্ধ’, যা ইসরাইলের দীর্ঘদিনের চাপে শুরু হয়েছে। তার ভাষ্যে, দুই দশক ধরে ইসরাইল ইরানে সামরিক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছিল এবং অবশেষে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করা ট্রাম্পের জন্য এটি এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক মোড়।
ইরানকে ঘিরে হুমকির বয়ান নতুন নয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময়ও নেতানিয়াহু সতর্ক করেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। যদিও তেহরান ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক প্রয়োজনে। এমনকি মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকেও স্বীকারোক্তি এসেছে যে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সরাসরি অস্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ওয়াশিংটনের হাতে নেই।
গত জুনে ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বাংকার বিধ্বংসী বোমা হামলা চালায়। পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন, ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংস’ হয়েছে। তবে এরপরই আলোচনায় আসে তেহরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরান ভবিষ্যতে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে যা যুক্তরাষ্ট্রকেও হুমকির মুখে ফেলবে। সমালোচকরা বলছেন, এ ধরনের বক্তব্য এখনো পরীক্ষিত প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং সম্ভাব্য হুমকির কল্পচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া সাম্প্রতিক ভাষণে ট্রাম্প ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তেহরান ইউরোপ ও বিদেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে। ইরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষা কর্মসূচি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক।
জনমতও এই যুদ্ধে বিভক্ত। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক জড়িত হওয়ার ব্যাপারে মার্কিন জনগণের বড় অংশ অনিচ্ছুক। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে মাত্র ২১ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সমর্থন জানিয়েছেন। তবুও প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে এবং হামলার আগে প্রেসিডেন্ট নিজেই সম্ভাব্য হতাহতের আশঙ্কা স্বীকার করেন।
এদিকে ফেব্রুয়ারির শুরুতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ হিসেবে আখ্যা দেয়। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। কিন্তু সেই আশাবাদের মাঝেই হঠাৎ হামলার সিদ্ধান্ত আলোচনার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার অগ্রগতিই হয়তো ইসরাইলি নেতৃত্বের উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যারা সম্ভাব্য চুক্তিকে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্যবিরোধী হিসেবে দেখছিল।
২০২৫ সালের জুনেও আলোচনার মাঝামাঝি সময়ে ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক সমাধান ব্যাহত করা এবং কঠোর অবস্থান বজায় রাখা। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি বলেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিতযুক্ত যেকোনো পদক্ষেপ নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক বিজয়, কিন্তু তা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ ও অপ্রত্যাশিত সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিরোধিতা জোরালো। কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব বলেন, মার্কিন জনগণ ‘আর যুদ্ধ নয়’—এই বার্তাই দিচ্ছে। তার অভিযোগ, প্রশাসন যুদ্ধপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও ইসরাইলি নেতৃত্বের প্ররোচনায় কাজ করছে। অপরদিকে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি যুক্তি দিয়েছেন, ইরান আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রধান উৎস। তবে রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসন পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কীভাবে সরাসরি একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিকের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই হামলার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা ইসরাইল পেতে পারে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগ তুলে ধরে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততা, সম্ভাব্য হতাহত, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ঝুঁকি কম নয়।
মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই ভূরাজনৈতিক জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে সামরিক পদক্ষেপের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইরানে সাম্প্রতিক হামলা সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। লাভ-ক্ষতির হিসাব সময়ই দেবে। তবে আপাতত প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই সংঘাত কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে, নাকি এটি আরেকটি দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা?