প্রকাশ: ৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝিনাইদহে এক বাবা তার পুত্রকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন ছাত্রলীগের সঙ্গে সক্রিয় থাকার কারণে। মঙ্গলবার (২ মার্চ) জেলার নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে মো. আবু জাফর নামে এক ব্যবসায়ী এই হলফনামা প্রদান করেন। হলফনামার মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে তার ছেলে মো. নাহিদ হাসান সবুজের সাথে তার কোনো রকম রক্ত সম্পর্ক, আইনগত দায়-দায়িত্ব অথবা পরিবারের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না।
মো. আবু জাফর জানান, তার ছেলে দীর্ঘদিন ধরে তার কথাকে উপেক্ষা করে নিজের মতো জীবন যাপন করছে। নাহিদ হাসান সবুজ বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন না এবং নিজের খেয়ালমতো আলাদা জীবনযাপন করছেন। তিনি আরও বলেন, ‘দেশের আইন ও নীতিমালার পরিপন্থী কোনো কাজ আমি চাই না আমার সন্তান করুক। বারবার সতর্ক করার পরও সে শোধরায়নি, তাই বাধ্য হয়ে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’
হলফনামায় বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও নাহিদ হাসান সবুজ এই সংগঠনের কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন। বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ে তিনি পতাকা উত্তোলন করেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় পিতা হিসেবে মো. আবু জাফর বিব্রত বোধ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন ত্যাজ্য ঘোষণার।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটী ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দী গ্রামের এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার সন্তান সবুজের কোনো আয়-রোজগার, দায়-দেনা বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমার বা পরিবারের অন্য সদস্যদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তার কোনো অপকর্মের দায়ভারও পরিবার বহন করবে না। ভবিষ্যতে তার সঙ্গে পরিবারের সকল রক্ত সম্পর্কীয় ও আইনি বিচ্ছেদ বজায় থাকবে।’
এই আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছেন জেলা জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট মো: সাদাতুর রহমান হাদি’র মাধ্যমে। নাহিদ হাসান সবুজের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোনটি খোলা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনা ঝিনাইদহের জন্য একটি নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই অভিভাবকের কঠোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে, কিছু প্রজন্মের তরুণরা মনে করছেন, রাজনৈতিক কর্মপ্রবণতার কারণে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা মানবিকভাবে অনেক কষ্টদায়ক। স্থানীয় শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক কর্মীরা এই ঘটনার মাধ্যমে পরিবার ও রাজনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিতামাতার অধিকার এবং সন্তানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সঠিক সমন্বয় না হলে এমন মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। পরিবারে অভিভাবকত্বের সীমা এবং সন্তানের স্বাধীনতার মধ্যে একটি স্পষ্ট রেখা থাকা জরুরি। মো. আবু জাফরের এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, এটি সামাজিক ও আইনগত প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সময়ে, নাহিদ হাসান সবুজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় ছাত্র রাজনীতিতে প্রভাব রয়েছে। তিনি ঝিনাইদহ সরকারি কেশবচন্দ্র (কেসি) কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবার এবং স্থানীয় সমাজে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে সকলেই আশা করছেন, শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং মানবিক সমঝোতার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন সম্ভব হতে পারে।
মো. আবু জাফরের হলফনামা শুধু ব্যক্তিগত ত্যাজ্যের প্রতীক নয়, এটি দেশের আইন ও নীতিমালার প্রতি অভিভাবকের ন্যায়সঙ্গত ও সচেতন দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ। এই ঘটনা বাংলাদেশের সমাজে পরিবার এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সম্পর্কের সীমা নির্ধারণে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
নির্দিষ্টভাবে বলা যায়, পরিবারের ঐক্য এবং সন্তানের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঝিনাইদহের এই ঘটনা ইতিমধ্যেই স্থানীয় সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেকে অভিভাবকের কঠোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও, অনেকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিচ্ছেদকে দুঃখজনক মনে করছেন।
পরিস্থিতি যেমনই হোক, মো. আবু জাফরের পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে পরিবারে আইন, নৈতিকতা এবং সামাজিক নীতিমালা রক্ষা করাই প্রথম প্রাধান্য। তবে মানবিক ও সামাজিক দিক বিবেচনা করেও ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে।