প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী এখন পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংস্থাটি এর আগে হুমকি দিয়েছিল, প্রয়োজন হলে তারা প্রণালীটি বন্ধ করতেও সক্ষম।
আইআরজিসির নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মুহাম্মদ আকবরজাদে এক বক্তব্যে বলেন, “বর্তমানে হরমুজ প্রণালী ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নৌবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” ইরানের রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি তার এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে। যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও এমন ঘোষণাকে ঘিরে বিশ্ববাজার ও কূটনৈতিক অঙ্গনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন বৈশ্বিক তেল রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী অতিক্রম করে। ফলে এখানকার যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
আইআরজিসি দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও নজরদারির বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর, বাইরের শক্তির নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে নৌ টহল জোরদার করে থাকে, বিশেষ করে যখন উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বে মন্তব্য করেছিলেন যে, প্রয়োজন হলে ট্যাঙ্কার সুরক্ষায় তিনি নৌবাহিনী মোতায়েন করতে প্রস্তুত। তার এমন অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অতীতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময় এই প্রণালীকে কেন্দ্র করে একাধিকবার উত্তেজনা দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক এই দাবির পেছনে আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি রপ্তানি ও সামরিক উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী একটি কৌশলগত চাপের বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইরান বারবার বলে এসেছে, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলে তারা পাল্টা পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। প্রণালী বন্ধের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে আইআরজিসি পূর্বে সতর্কবার্তাও দিয়েছিল।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করা হলে তা শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নয়, ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ ইরানের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশও এই পথ দিয়েই সম্পন্ন হয়। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
এদিকে তেলবাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করছে এবং বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছেন। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো, বিশেষ করে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো, হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে যেকোনো সামরিক বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য একটি প্রধান উৎস। ফলে হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হলে তা বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা। তারা মনে করেন, উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। সামরিক উপস্থিতি বা শক্তি প্রদর্শন সাময়িক বার্তা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার জন্য পারস্পরিক আস্থা ও সমঝোতা প্রয়োজন।
আইআরজিসির সর্বশেষ দাবিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি কী, তা নিশ্চিত হতে আরও তথ্য ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।