প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে একটি জ্বালানিবাহী কন্টেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মাল্টা-পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ ‘সেফেন প্রেস্টিজ’ বুধবার দুপুরের দিকে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে অবস্থানকালে একটি অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাটি ঘটে ওমান উপকূল থেকে মাত্র দুই নটিক্যাল মাইল উত্তরে, যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং কৌশলগত সমুদ্রপথ হিসেবে পরিচিত।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হামলাটি ছিল অত্যন্ত আকস্মিক এবং লক্ষ্যভেদী। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ভ্যানগার্ড জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি জাহাজের ওয়াটারলাইনের ঠিক ওপরে আঘাত হানে। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্রু সদস্যদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।
জাহাজটির ক্যাপ্টেন এবং ক্রু সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাহাজটি পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে জরুরি সংকেত পাঠানো হলে নিকটবর্তী জাহাজ এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করে।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও (United Kingdom Maritime Trade Operations) এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, হামলার পর জাহাজের সব ক্রু নিরাপদে জাহাজ ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া সমুদ্রে তেলের নিঃসরণ বা পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কাও আপাতত দেখা যায়নি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের বড় অংশই এই প্রণালির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল জ্বালানি এই জলপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বা সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধরনের হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় বাণিজ্যিক জাহাজকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক হামলা ও নিরাপত্তা সংকটের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো এই জলপথে নিরাপত্তা টহল জোরদার করেছে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারে।
এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে। অনেক জাহাজ কোম্পানি তাদের জাহাজ চলাচলের রুট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে হামলার পেছনে কারা জড়িত সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ দায় স্বীকার করেনি। তবে আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ঘটনাটিকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে এবং জাহাজের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
নৌ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়।
সেফেন প্রেস্টিজ জাহাজের ক্রু সদস্যদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় এড়ানো গেছে। তবে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক দেশই ইতোমধ্যে এই হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে কন্টেইনার জাহাজে এই হামলার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব অর্থনীতি কতটা সংবেদনশীল একটি সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। নিরাপত্তা ঝুঁকি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতা—সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চল আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেই থেকে যাবে।