তেল আতঙ্কে পাবনার পাম্পে বাইকারদের দীর্ঘ সারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৫৭ বার
তেল আতঙ্কে পাবনার পাম্পে বাইকারদের দীর্ঘ সারি

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে গেছে বাংলাদেশের স্থানীয় জ্বালানি বাজারেও। ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংঘাতের খবর ছড়িয়ে পড়তেই তেল সংকটের আশঙ্কায় পাবনায় হঠাৎ করে পেট্রল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল চালকদের ভিড় বেড়ে যায়। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ভিড় সন্ধ্যার পর রীতিমতো উপচে পড়া অবস্থায় পৌঁছায়। অনেক বাইকার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নেওয়ার চেষ্টা করায় রাতের আগেই বেশ কয়েকটি পাম্পে তেলের মজুত শেষ হয়ে যায় এবং রাত ১০টার পর অধিকাংশ পাম্প বন্ধ করে দেন মালিকরা।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই আতঙ্ক থেকেই পাবনায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মোটরসাইকেল চালকরা পেট্রল পাম্পে গিয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করতে থাকেন।

বিশেষ করে দুপুর গড়ানোর পর থেকে শহরের বিভিন্ন পাম্পে বাইকারদের উপস্থিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। বিকেলের দিকে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অনেক পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। শহরের মেরিল বাইপাস এলাকার Yakub Filling Station, অনন্ত বাজার এলাকার Highway Filling Station, রাধানগরের SM Farid Filling Station এবং কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন কয়েকটি পাম্পে সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

সন্ধ্যার পর পাম্পগুলোর সামনে শত শত মোটরসাইকেলের সারি দেখা যায়। অনেক চালকই তাদের মোটরসাইকেলের ট্যাংক পূর্ণ করার চেষ্টা করেন, এমনকি কেউ কেউ বাড়তি জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত ক্যানও নিয়ে আসেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষ এক পর্যায়ে তেল সরবরাহ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কয়েকটি পাম্পে প্রতি গ্রাহককে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তবে এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করেও চাপ কমানো যায়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অধিকাংশ পাম্পের দৈনিক মজুত শেষ হয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যার পর একে একে অনেক পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাত ১০টা পর্যন্ত দু-একটি বড় পাম্পে সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহ চললেও শেষ পর্যন্ত সেখানেও মজুত ফুরিয়ে যায়। এতে তেল সংগ্রহ করতে এসে অনেকেই খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

রাধানগরের এসএম ফরিদ ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক সাইমন ও রনি জানান, হঠাৎ করে তারা শুনেছেন যে পরদিন থেকে তেল পাওয়া নাও যেতে পারে। এই খবর শোনার পর তারা দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ে পাম্পে চলে আসেন। তারা বলেন, সাধারণত ট্যাংক পুরো ভর্তি না করলেও চলে, কিন্তু পরে যদি তেল না পাওয়া যায় সেই আশঙ্কায় এবার পূর্ণ ট্যাংক করতে চেয়েছিলেন। তবে পাম্পে সীমিত পরিমাণ তেল দেওয়ায় তারা সেই সুযোগ পাননি।

আরেক মোটরসাইকেল চালক সিয়াম মাহমুদ জানান, তিনি শহরের কয়েকটি ছোট পাম্প ঘুরে দেখেন যে অনেক জায়গায় তেল শেষ হয়ে গেছে। পরে তিনি মেরিল বাইপাস এলাকার ইয়াকুব ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তেল নিতে সক্ষম হন। সেখানে প্রায় একশটির বেশি গাড়ির সারি ছিল বলে তিনি জানান। তার মতে, অনেকেই আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তেল না পেয়ে ফিরে আসা কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক জানান, তারা মূলত পেশাগত কাজের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। নিয়মিত প্রয়োজন অনুযায়ী তেল ভরলেও সেদিন অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে তারা তেল নিতে পারেননি। তাদের বক্তব্য, আতঙ্কের কারণে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

অনন্ত বাজার এলাকার হাইওয়ে ফিলিং স্টেশনের এক কর্মচারী ইসরাফিল বলেন, হঠাৎ করেই পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় শুরু হয়। তারা রাত ১০টা পর্যন্ত প্রতি গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গ্রাহকের চাপ এত বেশি ছিল যে শেষ পর্যন্ত তাদের দিনের মজুত শেষ হয়ে যায়। তিনি জানান, পরদিন ভোরে নতুন করে তেল সরবরাহ আসার কথা রয়েছে।

এদিকে পাম্প মালিকদের সংগঠনও পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে। Bangladesh Petrol Pump Owners Association-এর মহাসচিব Abul Hossain Reyon বলেন, দেশের জ্বালানি মজুত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সরকার মাত্র ১৪ দিনের তেল মজুত রেখেছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার কারণে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এর ফলে মানুষ প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন।

তিনি আরও বলেন, বাস্তবে দেশের জ্বালানি সরবরাহে কোনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে। তবে হঠাৎ করে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হলে সাময়িকভাবে কিছু পাম্পে তেল শেষ হয়ে যেতে পারে। তিনি সবাইকে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল নেওয়ার আহ্বান জানান।

পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, খোলা বাজারে বা অননুমোদিতভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রাখার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। যাতে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার খবর অনেক সময় স্থানীয় বাজারে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে মানুষ ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আশঙ্কা থেকে অতিরিক্ত মজুত করতে চায়। এর ফলে স্বল্প সময়ের জন্য বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে এবং মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ইতোমধ্যে পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, নতুন সরবরাহ আসার পর শুক্রবার সকাল থেকেই আবার নিয়মিতভাবে তেল বিক্রি শুরু হবে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের খবরের প্রভাবেই পাবনায় পেট্রল পাম্পগুলোতে এই অস্বাভাবিক ভিড়ের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি সাময়িক আতঙ্কের ফল এবং দেশে জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো সংকট তৈরি হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত