হরমুজ প্রণালি খোলা রাখবে ইরান, তবে সতর্কবার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৫ বার
হরমুজ প্রণালি খোলা রাখবে ইরান, তবে সতর্কবার্তা

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বজুড়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় ইরান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা করছে না। একইসঙ্গে দেশটি সতর্ক করে দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র শুক্রবার এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ আপাতত খোলা রাখা হবে এবং সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কোনো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে না। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ইতোমধ্যেই এ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ইরানি সেনাবাহিনীর ওই মুখপাত্র বলেন, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ এবং ইরান এই পথ বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতে চায় না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক জাহাজই বিকল্প পথ খুঁজছে অথবা তাদের যাত্রা বিলম্বিত করছে। তিনি আরও বলেন, ইরান কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে সরাসরি বাধা দেবে না, তবে যে কোনো জাহাজকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে।

তবে একই সঙ্গে তিনি একটি কঠোর সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। ইরানের দাবি অনুযায়ী, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো সামরিক বা সংশ্লিষ্ট জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হতে পারে। এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ এই প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই সরু কিন্তু অত্যন্ত ব্যস্ত জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ চলাচল করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এবং ভারতের মতো দেশগুলো এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে থাকে।

চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা মূল্যায়ন শুরু করেছে। অনেক কোম্পানি সাময়িকভাবে এই পথ ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প রুট ব্যবহার করার পরিকল্পনাও করছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লেই দেশটি মাঝে মাঝে এই প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দেয়। যদিও বাস্তবে সম্পূর্ণভাবে এটি বন্ধ করার ঘটনা এখনো ঘটেনি, তবু প্রতিবার এমন হুমকি বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের ঘোষণা কিছুটা স্বস্তি দিলেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। কারণ ইরান স্পষ্টভাবে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। ফলে এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে এই প্রণালির আশপাশে সামরিক উপস্থিতিও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই চাপের মুখে পড়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি ব্যয় ও অর্থনীতির ওপর। ফলে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে ইরানের সাম্প্রতিক ঘোষণায় আপাতত প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় নতুন ঘটনা ঘটতে পারে এবং তা বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত