প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত রূপ নিচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েল এখন লেবাননেও বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় কমপক্ষে ১২৩ জন নিহত এবং কয়েক শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে পাল্টা জবাব হিসেবে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে এবং সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ১২৩ জন নিহত এবং ৬৮৩ জন আহত হয়েছেন। হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি জনবসতিপূর্ণ এলাকা। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান দক্ষিণ লেবাননের শ্রিফা, আইতা আল-শাব, তুলিন, আস-সাওয়ানা ও মাজদাল সেলেম শহরে একাধিক বিমান হামলা চালায়। একই সময় পূর্ব লেবাননের দৌরিস শহরেও আরেকটি আক্রমণের ঘটনা ঘটে।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠ দাহিয়েহ এলাকাতেও নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এই অঞ্চলটিকে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর দাবি, দাহিয়েহ এলাকায় তারা হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সংগঠনটির নির্বাহী পরিষদের সদরদপ্তর এবং একটি অস্ত্রগুদামও ছিল।
তবে এসব হামলার ফলে বেসামরিক মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দাহিয়েহ এলাকাটি বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ উপকণ্ঠ হওয়ায় সেখানে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হামলার ভয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে গেছেন। অনেক পরিবার রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের সিডন শহরেও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে টায়ার ও বিনতে জ্বাইল শহরের ওপরও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান থেকে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলার কারণে দক্ষিণ লেবাননের বহু শহর কার্যত আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের আক্রমণের জবাবে হিজবুল্লাহও পাল্টা হামলা জোরদার করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তেল আবিবসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হামলার আওতায় পড়েছে বলে দাবি করেছে হিজবুল্লাহ।
হিজবুল্লাহর নেতারা ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সব শহরের বাসিন্দাদের এলাকা খালি করে চলে যেতে হবে। সংগঠনটির দাবি, ইসরায়েল যদি লেবাননে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে তারা আরও বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ চালাতে বাধ্য হবে।
শুক্রবার ভোরে হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের যোদ্ধারা লেবাননের ভূখণ্ডে প্রবেশকারী ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। টেলিগ্রামে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, মারুন আল-রাস এবং কফার কিলা অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে অধিকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের ইয়াভ সামরিক ঘাঁটি এবং হাইফা বন্দরের একটি নৌঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছে সংগঠনটি।
হিজবুল্লাহর এই ধারাবাহিক পাল্টা হামলা সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতাকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ বহু বছর ধরে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তিশালী সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে।
হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসনের জবাব তারা দেবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, লেবাননের অবকাঠামো ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার যে অভিযান চালানো হচ্ছে, তা কোনোভাবেই অগ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা তাদের সীমান্তবর্তী শহরগুলো খালি করবে না এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় লেবানন সীমান্তে আরও সেনা মোতায়েন করা হবে। ইসরায়েলের সামরিক কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে লেবাননের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে অনেক এলাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, বহু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে বৈরুতের সমুদ্রসৈকতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে হাজার হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে আবারও ফিরিয়ে এনেছে। অনেক পরিবার আবারও যুদ্ধের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মহলেও এই সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ লেবাননে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, লেবাননকে রক্ষা করতে সবকিছু করতে হবে এবং যুদ্ধ যেন আর বিস্তৃত না হয় তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
মাখোঁ জানিয়েছেন, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং লেবাননে সংঘাত আরও বাড়তে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী জোসেফ আউনের অনুরোধের পর তিনি এই যোগাযোগ করেন বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তাহলে তা শুধু লেবানন বা ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন একটাই—এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে এবং এর শেষ পর্যন্ত কতটা মূল্য দিতে হবে পুরো অঞ্চলকে।