প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রশ্নে বিদেশি হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে তেহরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ও অন্যান্য সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরানের সংবিধান অনুযায়ী নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’। এই প্রতিষ্ঠানই আইনগতভাবে সর্বোচ্চ নেতাকে নির্বাচন করার ক্ষমতা রাখে।
সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস খুব শিগগিরই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি ইরানের নিজস্ব সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই সম্পন্ন হবে বলে তিনি জোর দিয়ে বলেন।
আরাগচি বলেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব নিয়মিতভাবে পালন করছে। তার মতে, দেশের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিসভা ও পার্লামেন্ট—সবগুলো প্রতিষ্ঠানই নির্ধারিত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ইরানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে কোনো ধরনের অস্থিরতা নেই। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিতভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে এবং জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ কারণে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের বিষয়টিও একটি সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হবে।
সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যেরও জবাব দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ট্রাম্প ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করার পর তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
আরাগচি বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বাইরের শক্তির মন্তব্য বা হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা ইরানি জনগণের বিষয় এবং এতে অন্য কোনো দেশের ভূমিকা থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
তার ভাষায়, “নতুন নেতা নির্বাচন করা ইরানি জনগণের বিষয়। এটি শুধুই ইরানের জনগণের ব্যাপার, অন্য কারও নয়।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক মহলকে স্পষ্ট বার্তা দেন যে ইরান তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে চায়।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর পদ। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়কত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই পদ অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। ফলে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নামের যে প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে, সেটি মূলত নির্বাচিত ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকদের একটি পরিষদ। এই পরিষদের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন এবং তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে নির্বাচন করা এবং প্রয়োজনে তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতার পদ শূন্য হলে বা নতুন নেতা নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দিলে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বৈঠকে বসে এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় ভিন্ন। সেখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বিশেষ ভারসাম্য বিদ্যমান। সর্বোচ্চ নেতা সেই কাঠামোর কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের বিষয়টি শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে। ফলে দেশটির নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে তা আঞ্চলিক রাজনীতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এসব আলোচনা বা আন্তর্জাতিক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও নেতা নির্বাচন পুরোপুরি ইরানের নিজস্ব বিষয়। এতে কোনো বিদেশি শক্তির প্রভাব বা হস্তক্ষেপ গ্রহণ করা হবে না।
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তেহরান মূলত তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে ঘিরে নানা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনা চলছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব বিষয়েও ইরান নিয়মিত আন্তর্জাতিক আলোচনায় থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন নিয়ে দেশটির অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে দেশের নিজস্ব সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে।