ট্রাম্পের বাণিজ্য তদন্তে তালিকায় বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
ট্রাম্প বাণিজ্য তদন্তে বাংলাদেশের নাম

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য তদন্তে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা’ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে। সেই তালিকায় বাংলাদেশ, চীন, ভারতসহ এশিয়া ও ইউরোপের একাধিক দেশ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর স্থানীয় সময় বুধবার এই তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেয়। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, তদন্তে কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে আমদানি শুল্কারোপের আইনি ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

এই তদন্ত উদ্যোগকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির একটি নতুন ধাপ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর শুল্কনীতি নিয়ে আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের পর নতুন করে এই তদন্ত শুরু হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের সীমাবদ্ধতার কারণে সরাসরি শুল্ক আরোপে বাধা তৈরি হওয়ায় প্রশাসন এখন তদন্তের মাধ্যমে নতুন আইনি পথ তৈরি করতে চাইছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই তদন্তের মূল লক্ষ্য বিভিন্ন দেশের উৎপাদন খাতে ‘কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা’ এবং সংশ্লিষ্ট নীতিগত কার্যক্রম পর্যালোচনা করা। তাদের ধারণা, কিছু দেশ নিজেদের অতিরিক্ত উৎপাদন আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে সেই পরিস্থিতি যাচাই করতে এবং সম্ভাব্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১-এর আওতায় এই তদন্ত পরিচালিত হবে। এই আইনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, যাদের বাণিজ্য নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বৈষম্যমূলক বা অযৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়। যদি তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করা সম্ভব হবে।

এই অনুসন্ধানের আওতায় যেসব দেশের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং নরওয়ে। পাশাপাশি আঞ্চলিক জোট হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও তদন্তের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডাকে এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, তদন্ত শেষ হলে আগামী গ্রীষ্ম নাগাদ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে নতুন শুল্কারোপের ঘোষণা আসতে পারে। বিশেষ করে বড় অর্থনীতির দেশ যেমন চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোর ওপর সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভর করবে তদন্তের ফলাফলের ওপর।

এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। কয়েক সপ্তাহ আগে Supreme Court of the United States প্রেসিডেন্টের জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে আরোপ করা শুল্কের বিষয়ে একটি সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। গত বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে জানায়, প্রেসিডেন্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে এ ধরনের শুল্কারোপ করতে পারেন না।

আদালতের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী আমদানি শুল্ক আরোপের মূল ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে রয়েছে। জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে একতরফাভাবে শুল্ক বসানো কর্তৃত্বের সীমা অতিক্রম করেছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। আদালতের প্রধান বিচারপতি John Roberts বলেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন থাকতে হবে।

এই রায়ের পরই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে বৈশ্বিক শুল্কনীতি নিয়ে উদ্যোগ নেয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরবর্তীতে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন এবং ভবিষ্যতে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথাও জানান। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির শেষে আরোপ করা অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ আগামী জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা। তার আগেই চলমান বাণিজ্য তদন্ত সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই তদন্ত কিছুটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ালেও সংশ্লিষ্টরা এটিকে এখনই বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন না। তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association–এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতিরিক্ত উৎপাদনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এই তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি খুব বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি মনে করেন না।

তার মতে, যেসব বিষয়ে তদন্ত হতে পারে তার অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিশেষ করে শ্রম অধিকার, মেধাস্বত্ব এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগের তুলনায় অনেক উন্নতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। কিন্তু এ ধরনের পোশাক উৎপাদনে মার্কিন ব্যবসায়ীরা সাধারণত খুব বেশি আগ্রহী নয়। ফলে এই খাতে সরাসরি প্রতিযোগিতার বিষয়টি তুলনামূলকভাবে সীমিত।

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছেন। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, যেহেতু তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের নাম এসেছে, তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। তার মতে, সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম কৌশল গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত শুল্কারোপ হলে তা পোশাক শিল্পের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই তদন্ত মূলত বৈশ্বিক বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর চাপ বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি শুল্কারোপের একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা বলেও মনে করা হচ্ছে।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই আলোচনা ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পথ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মার্চের শেষ দিকে ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন বাণিজ্য তদন্ত বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য সম্ভাব্য শুল্কনীতি ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এখন তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রাখছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত