হরমুজ সংকটে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
হরমুজ প্রণালি ইরান যুক্তরাষ্ট্র সংকট

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ঘিরে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের এমন একটি কৌশলগত জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের বড় অংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে জ্বালানি পৌঁছানোর প্রধান রুট এটি।

সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে প্রণালির আশপাশে বেশ কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এতে অনেক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে এবং ইউরোপীয় বাজারে গ্যাসের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিশ্ব রাজনীতিতেও। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে এই সংকট মোকাবিলায় মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে তার আহ্বানে প্রত্যাশিত সাড়া এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু সামরিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে। এরপর থেকে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং সংঘাত এখন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। যুদ্ধের ১৬তম দিনে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন এবং আলোচনার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন। অন্যদিকে ইরানও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, হামলা বন্ধ না হলে তারা কোনো ধরনের আলোচনায় বসবে না। ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরানের শত্রুদের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকতে পারে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মিত্র দেশের সহযোগিতা চেয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে। যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্স এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এসব দেশ এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে। তবে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

জাপানের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় এই বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।

এদিকে চীনও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, বেইজিং অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সব পক্ষের দায়িত্ব এবং এ বিষয়ে চীন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবে।

ফ্রান্সও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর গুজব নাকচ করেছে দেশটি। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহী রণতরী বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে এবং সেটি অন্য কোথাও পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

সংঘাতের সামরিক দিকেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে শিরাজ ও হরমুজগান প্রদেশেও।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থানে শত শত হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এসব হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বহু সদস্য হতাহত হয়েছে। যদিও এই সংখ্যার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। ইসরাইল জানিয়েছে, তাদের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রতিশোধমূলক অভিযানের অংশ হিসেবে এই হামলা চালিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও এই সংঘাতের প্রভাব অনুভব করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। যদিও ইরান এসব হামলার দায় অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে, তাদের প্রযুক্তির নকল ব্যবহার করে তৃতীয় পক্ষ এসব হামলা চালাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের সতর্ক করেছে। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দ্রুত দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর আগে ইরাকেও একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই সংকট শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। তার মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও জ্বালানি সরবরাহ বাড়বে এবং বাজার স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের মধ্যেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সংঘাত কমাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষার সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত