আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক সের্হিও রোমেরোর অবসর ও কোচিং যাত্রা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২৮ বার
সের্হিও রোমেরোর অবসর

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে গোলপোস্টের নিচে যে ক’জন নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তাঁদের অন্যতম সের্হিও রোমেরো। প্রশস্ত কাঁধ, শান্ত অথচ দৃঢ় চাউনি আর সংকটময় মুহূর্তে অবিচল উপস্থিতি—এই সব মিলিয়েই গড়ে উঠেছিল ‘চিকিতো’ নামে পরিচিত এই গোলরক্ষকের কিংবদন্তি সত্তা। প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারের ইতি টেনে অবশেষে অবসর ঘোষণা করেছেন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এই গোলরক্ষক। ৩৯ বছর বয়সে গ্লাভসজোড়া তুলে রাখলেও ফুটবলকে বিদায় জানাচ্ছেন না তিনি; বরং কোচ হিসেবে শুরু করতে যাচ্ছেন জীবনের নতুন অধ্যায়।

আর্জেন্টাইন সাংবাদিক ফেদে ক্রিস্তোফানেল্লির তথ্য অনুযায়ী, অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি ইতিমধ্যেই নিজের কোচিং স্টাফও গুছিয়ে নিয়েছেন রোমেরো। মাঠের ভেতর গোলরক্ষক হিসেবে যে নেতৃত্ব ও স্থিরতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটিকেই এবার তিনি মাঠের বাইরে কোচিংয়ের মাধ্যমে ফুটবল জগতে কাজে লাগাতে চান। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিষয়টি যেমন আবেগঘন, তেমনি আশাব্যঞ্জকও—কারণ, অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তায় সমৃদ্ধ একজন সাবেক তারকা আবারও ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন ভিন্ন ভূমিকায়।

আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে ৯৬টি ম্যাচ খেলেছেন সের্হিও রোমেরো, যা দেশটির ইতিহাসে গোলরক্ষকদের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিসংখ্যানের বাইরে তাঁর ক্যারিয়ার ছিল নানা নাটকীয় মুহূর্তে ভরপুর। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচটি আজও আর্জেন্টাইন ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেই ম্যাচে টাইব্রেকারে দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলেন। ম্যাচের আগে সতীর্থ হাভিয়ের মাচেরানোর সেই বিখ্যাত কথা—“আজ তুমি নায়ক হয়ে যাবে”—পরবর্তীতে যেন ভবিষ্যদ্বাণীর মতোই সত্যি হয়ে উঠেছিল।

বিশ্বকাপের ফাইনালে যদিও জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হার মানতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে, তবু পুরো টুর্নামেন্টে রোমেরোর পারফরম্যান্স তাঁকে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়েও তিনি জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক ছিলেন। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হলেও গোলপোস্টের নিচে তাঁর উপস্থিতি ছিল দলের জন্য বড় ভরসা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে বড় শিরোপা না জিতলেও বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তাঁর সাফল্য কম নয়। ২০০৭ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি। পরের বছর ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে লিওনেল মেসিদের সঙ্গে স্বর্ণপদক জিতে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ক্লাব ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রেসিং ক্লাবে। সেখান থেকেই ইউরোপ যাত্রা শুরু। নেদারল্যান্ডসের এজেড আলকমারের হয়ে খেলতে গিয়ে দ্রুত নজর কাড়েন তিনি। এরপর ইতালির সাম্পদোরিয়া, ফ্রান্সের মোনাকো হয়ে ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন। ইউনাইটেডে বেশির ভাগ সময় তাঁকে দ্বিতীয় পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে থাকতে হলেও সুযোগ পেলেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। বিশেষ করে ২০১৬-১৭ মৌসুমে ইউরোপা লিগ জয়ে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই সময়ের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে সমর্থকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তোলে।

ইউরোপীয় অধ্যায় শেষ করে ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে দেশে ফেরেন রোমেরো। রেসিং ক্লাবে ফেরার পর তরুণ গোলরক্ষক ফাকুন্দো কামবেসেসের বিকল্প হিসেবে খেলতে চাইলেও প্রত্যাশিত সুযোগ পাননি। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে কোপা আর্জেন্টিনায় নিজের শেষ ম্যাচটি খেলে পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান। বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর চোখে-মুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ—কারণ, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেশের জন্য এবং বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

রোমেরোর অবসর ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে উঠেছে অসংখ্য স্মৃতিচারণ। সতীর্থ, কোচ এবং সমর্থকেরা তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ফুটবলে তাঁর অবদানের জন্য। বিশেষ করে ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই সেমিফাইনালের কথা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকেই বলছেন, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে গোলরক্ষকদের তালিকায় রোমেরোর নাম সব সময়ই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, রোমেরোর বড় শক্তি ছিল তাঁর মানসিক দৃঢ়তা। বড় ম্যাচের চাপ সামলে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। গোলরক্ষকের জন্য প্রয়োজনীয় নেতৃত্বগুণও ছিল তাঁর মধ্যে। তাই কোচ হিসেবে তাঁর নতুন যাত্রা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, মাঠে অর্জিত অভিজ্ঞতা তাঁকে কোচিংয়েও সফল হতে সাহায্য করবে।

আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষা করছেন নতুন ভূমিকায় ‘চিকিতো’কে দেখার জন্য। গোলপোস্টের নিচে ডাইভ দিয়ে বল বাঁচানোর দৃশ্য হয়তো আর দেখা যাবে না, কিন্তু ডাগআউটে স্যুট-টাই পরা এক শান্ত, আত্মবিশ্বাসী কোচ হিসেবে তাঁকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন অনেকে। ফুটবল ইতিহাসে অনেক তারকার মতো তিনিও হয়তো প্রমাণ করবেন—খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলেও ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক কখনো শেষ হয় না।

রোমেরোর বিদায় তাই কেবল একজন গোলরক্ষকের অবসরের গল্প নয়; এটি একটি সময়ের সমাপ্তি এবং আরেকটি সময়ের সূচনার প্রতীক। তাঁর ক্যারিয়ার যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি তাঁর নতুন পথচলাও হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তিনি থাকবেন এক অনন্য নাম হয়ে, আর সমর্থকেরা অপেক্ষা করবেন—কোচ রোমেরোর হাত ধরে হয়তো আবারও আসবে নতুন সাফল্যের গল্প।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত