গ্যাস সংকটে সুরাটের পোশাক শিল্পে ধসের শঙ্কা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬
  • ৮ বার
সুরাটে গ্যাস সংকটে

প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী সুরাট এখন এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এলপিজি গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে শহরটির বিশাল টেক্সটাইল শিল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে লাখো শ্রমিকের জীবনে এবং ভারতের রপ্তানি খাতে।

সুরাট দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শ্রমিকদের শ্রমেই গড়ে উঠেছে এই শিল্পভিত্তি। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং ওডিশা থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকেরা এই শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু গত কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাসের অভাবে তাদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় এলপিজি সিলিন্ডার না পাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেকেই কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো খাবার রান্না করতে পারছেন না। ফলে কাজ থাকা সত্ত্বেও তারা শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সুরাটের উধনা রেলস্টেশন এখন পরিণত হয়েছে এমন হাজারো শ্রমিকের ভিড়ের কেন্দ্রে, যারা নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতি শুধু মানবিক সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিল্প উৎপাদনেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কারখানা সপ্তাহে এক বা দুই দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি অনেক ইউনিট ইতোমধ্যেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই প্রবণতা চলতে থাকলে বৈশ্বিক বাজারে ভারতের কাপড় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

শ্রমিক কলোনিগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকেই সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এই সুযোগে কালোবাজারে এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। যেখানে সাধারণ সময়ে একটি ছোট সিলিন্ডারের দাম ছিল ৫০০ রুপি, এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার রুপিতে। প্রতি কেজি গ্যাসের দাম পৌঁছেছে ৫০০ রুপিতে, যা নিম্নআয়ের শ্রমিকদের নাগালের অনেক বাইরে।

সীমা দেবীর মতো অসংখ্য শ্রমিকের জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। সাত দিন আগে গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি কাঠের চুলায় রান্নাও করতে পারছেন না, কারণ তা নিষিদ্ধ। সঞ্চিত অর্থও শেষ হয়ে আসছে। ফলে সন্তানদের নিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তই তার কাছে একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই একক ঘটনা নয়, বরং হাজারো পরিবারের বাস্তবতা।

ভারতের জ্বালানি নির্ভরতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটির মোট এলপিজি আমদানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার কারণে সরবরাহ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। ভারত সরকার বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির চেষ্টা করলেও সমুদ্রপথে পরিবহন বিলম্বিত হওয়ায় সংকট কাটছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুরাটের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু স্থানীয় শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সামনে উৎসবের মৌসুম থাকায় কাপড়ের চাহিদা বাড়ার কথা, কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে সাধারণ ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।

শিল্পপতিরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। কারণ এই সংকটের মূল উৎস আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, যা স্থানীয় উদ্যোগে সহজে সমাধানযোগ্য নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন না মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমে আসে এবং হরমুজ প্রণালী আবার স্বাভাবিকভাবে চালু হয়, ততদিন এই সংকটের পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। ফলে ভারতের অন্যতম গৌরবময় বস্ত্রশিল্প এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, সুরাটের এই সংকট একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে—শুধু ভারতের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও। শ্রমিকের অভাব, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা একত্রে কীভাবে একটি শক্তিশালী শিল্পখাতকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে এই পরিস্থিতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত