প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদের মোহনা এলাকায় আবারও জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা উপকূলীয় জনপদে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যরা তিনটি মাছ ধরার ট্রলারসহ ১৩ জন জেলেকে আটক করে নিয়ে গেছে। শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে সাগরে মাছ ধরা শেষে টেকনাফে ফেরার পথে শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আটক হওয়া তিনটি ট্রলারের মালিক শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা মো. কালু ওরফে মালা হালু, মো. মুস্তাফিজ এবং মীর কাশিম। ট্রলারগুলোতে থাকা জেলেরা প্রতিদিনের মতো সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। দীর্ঘ সময় সাগরে কাজ শেষ করে তারা ঘরে ফিরছিলেন। কিন্তু উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাদের পথরোধ করে ট্রলারসহ জেলেদের নিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ধরে নিয়ে যাওয়া জেলেদের মধ্যে রয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান (৪০), ফরিদ হোসেন (৩০), রবিউল হাসান (১৭), কালাম (৩০), হোসেন আহমদ (৩৮), মীর কাশেম আলী (৪০), গিয়াস উদ্দিন, সালাউদ্দিন (১৮), মহিউদ্দিন (২২), মলা কালু মিয়া (৫৫), আবু তাহের (৪০), আবদুল খালেক এবং জাবের মিয়া (২৪)। তারা সবাই টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের অনেকেই এ দলে থাকায় তাদের স্বজনদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বেড়েছে, যা উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়ের জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জেলেরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যান। কিন্তু সীমান্তবর্তী জলসীমায় অনিরাপত্তার কারণে অনেকেই এখন সাগরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে জীবিকা নির্বাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যরা মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম জানান, ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে জেলেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা এনায়েত উল্লাহ বলেন, সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনার কারণে জেলে পল্লীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে তাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম জানান, অতীতেও একাধিকবার জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে তিনি মনে করেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় জেলেদের দাবি, গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মি প্রায় ৫০০ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে পরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ২০০ জন জেলে তাদের হেফাজতে রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। সবশেষ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩ জন জেলে মুক্তি পান, যা কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও সাম্প্রতিক ঘটনার ফলে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী জলসীমায় জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন অনেক জেলে সাগরে যান, কিন্তু অনিরাপদ পরিস্থিতির কারণে তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস মাছ ধরা হওয়ায় এমন ঘটনা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়, পুরো জেলে সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে জেলেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শাহপরীর দ্বীপের জেলে পল্লীগুলোতে এখন উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার প্রহর চলছে। নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সদস্যরা প্রতিনিয়ত তাদের প্রিয়জনদের ফেরার আশায় দিন গুনছেন। অনেক পরিবারই জানিয়েছেন, তারা এখন দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়রা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নেবে এবং আটক জেলেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এই ঘটনার পর আবারও সীমান্তবর্তী জলসীমায় নিরাপত্তা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। জেলে সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন এবং উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।