প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করলো ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। শনিবার (২৮ মার্চ) তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে এবং ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা সফলভাবে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। হুতিরা তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই হামলা ইসরায়েলের ‘স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনা’ লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে এবং এটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় সংঘটিত হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার হুতিরা সতর্কবার্তা জারি করেছিল যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যদি অন্য কোনো দেশ যোগ দেয় এবং লোহিত সাগর থেকে হামলা চালানো হয়, তাহলে তারা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে। হুঁশিয়ারির এক দিন পরই হুতিরা আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগদান করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুতিদের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। ইয়েমেনের বাইরে দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকায় লোহিত সাগর অঞ্চলে জাহাজ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
ইরানের মিত্র বিভিন্ন গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই লেবানন ও ইরাকে সংঘাতে জড়িত হয়েছে। হুতিদের যোগদানের ফলে ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতটি এখন আরো বিস্তৃত আকার নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হলেও এতদিন হুতিরা আনুষ্ঠানিকভাবে এতে অংশগ্রহণ করেনি। তবে তারা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, যেখান থেকে লোহিত সাগরের কৌশলগত জাহাজ চলাচল প্রভাবিত করা সম্ভব। হুতিদের যোগদানের ফলে আঞ্চলিক জাহাজ চলাচল, বাণিজ্যিক পরিবহন এবং সামরিক নৌসীমায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
হুতি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা লোহিত সাগরকে ইরান বা অন্য কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় ব্যবহার করবে না। এই ঘোষণায় কিছুটা আশ্বাস প্রদান হলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের সম্প্রসারণ এবং দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতার কারণে প্রতিক্রিয়াশীল সংঘাতের সম্ভাবনা কম নয়।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুতিদের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতকে আরও জটিল এবং বিস্তৃত করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইয়েমেনের হুতিরা ২০১৪ সাল থেকে দেশটির বিভিন্ন অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আসছে। ইরান এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় রেখে তাকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। হুতিরা তাদের অস্ত্রাগার, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
হুতিদের যোগদানের ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত কেবল আঞ্চলিক সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে এই সংঘাতের ফলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, যা তেল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলাকে প্রভাবিত করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুতিদের অংশগ্রহণ ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। ইরানের মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় এবং দূরপাল্লার হামলার ক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। যদিও হুতিরা লোহিত সাগরকে সরাসরি সামরিক হামলার জন্য ব্যবহার করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ স্থায়ী।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, হুতিদের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইরান ও ইয়েমেনের এই মিত্রতা আগামী দিনে সামরিক সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইতিমধ্যেই হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে, কিন্তু সংঘাতের নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ায় অঞ্চলজুড়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আঞ্চলিক শক্তি সমীকরণের ওপর এই হুতির পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কেবল সামরিক ময়দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নৌপরিবহন এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। হুতিদের যোগদানের ফলে সংঘাতটি এখন অনেক বেশি জটিল ও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে, যা বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করে তুলছে।