ইন্দোনেশিয়ায় শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬
  • ৪৫ বার
ইন্দোনেশিয়ায় শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে শিশুদের সুরক্ষার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করল ইন্দোনেশিয়া। দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সী প্রায় সাত কোটি শিশু রয়েছে এবং তাদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সরকার এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শনিবার (২৮ মার্চ) থেকে দেশজুড়ে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না।

ইন্দোনেশিয়ার সরকার বিশেষ করে সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা, পর্নোগ্রাফি এবং স্ক্রিন অ্যাডিকশনের মতো সমস্যা রোধ করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের প্রাথমিক তালিকায় বেশ কিছু ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক, এক্স (সাবেক টুইটার), বিগো লাইভ, রোবলক্স এবং থ্রেডস।

নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে। বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট থাকলে তা নিষ্ক্রিয় বা মুছে দিতে হবে। ইন্দোনেশিয়ার যোগাযোগ ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী মেউত্যা হাফিদ শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আইন মানার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। ইন্দোনেশিয়ায় ব্যবসা করতে হলে বিদ্যমান নীতিমালা মেনে চলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, এক্স, বিগো লাইভ, টিকটক ও রোবলক্স ইতিমধ্যে নীতিমালার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কাজ শুরু করেছে এবং অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইন্দোনেশিয়ার পদক্ষেপটি উল্লেখযোগ্য। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা চালু করেছে। এরপর যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ডেনমার্ক, গ্রিস, স্পেন, আয়ারল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়াও একই ধরনের নীতি বিবেচনা করছে।

জাতিসংঘের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় অর্ধেক অপ্রাপ্তবয়স্ক অনলাইনে যৌন হয়রানি বা বুলিংয়ের শিকার হয়। এই পরিসংখ্যানকে সামনে রেখে সরকার মনে করছে, সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

তবে এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। পশ্চিম কালিমন্তান প্রদেশের ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যাবিগেল বলেন, ‘তথ্য খোঁজা বা বিনোদনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ। পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে বয়স অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা ভালো ছিল।’ এ ছাড়া অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্দোনেশিয়ার নির্বাহী পরিচালক উসমান হামিদ এই সিদ্ধান্তকে ‘জটিল সমস্যার অতি সরল সমাধান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘শিশুদের ডিজিটাল জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে বরং সেই জগৎকে নিরাপদ করার দিকে নজর দেওয়া উচিত।’

অনেকে মনে করছেন, সরকারের এই পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবারের ভেতরেও শিশুদের ডিজিটাল শিক্ষা ও নজরদারি জরুরি। ৩২ বছর বয়সী মা ফ্রান্সিসকা আঞ্জেলিনা বলেন, ‘সরকারের নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বাড়িতে মা-বাবার নজরদারি এবং স্বাস্থ্যকর ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া বেশি জরুরি। যেটা শিশুদের নিরাপদ রাখবে।’

দেশের শিক্ষাবিদ এবং শিশু বিশেষজ্ঞরাও এই বিষয়ে আলাদা মত প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করা হলেও শিশুদের সাইবার সচেতনতা এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার শেখানো উচিত। প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলে শিশুদের শিক্ষার সুযোগও সীমিত হয়ে যেতে পারে। অনেকের মতে, ইন্দোনেশিয়ার এই পদক্ষেপ একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার চেয়ে প্রয়োজন শিশুরা কিভাবে নিরাপদে অনলাইন ব্যবহার করতে পারে তা শেখানো। অনলাইনে তথ্যের প্রবাহ রোধ করা সম্ভব নয়, তাই শিশুদের সচেতন করে নিরাপদ ডিজিটাল অভিজ্ঞতা দেওয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর, ভিন্ন বয়সের শিশুদের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন ফিচার তৈরি করতে হবে। ইন্দোনেশিয়ার আইন অনুযায়ী, আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা, অ্যাকাউন্ট ব্লক বা স্থায়ী নিষিদ্ধের শাস্তি দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার এই উদ্যোগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সাইবার বুলিং ও অনলাইন আসক্তি রোধে শিশুরা নিরাপদে অনলাইনে অংশ নিতে পারবে, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষক ও প্রযুক্তি কোম্পানির সমন্বয় অপরিহার্য।

ইন্দোনেশিয়ার এই পদক্ষেপ একটি বড় সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে, যা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে। তবে এই আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সচেতনতার সঙ্গে বাস্তবায়ন শিশুদের জন্য কার্যকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com