ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে (ইউসিএল) দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন আর্জেন্টাইন তরুণ মিডফিল্ডার নিকো পাজ। গোল করা ও সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে চলতি মৌসুমে প্রতিযোগিতার অন্যতম আলোচিত খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন তিনি। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি প্রয়াত এক বন্ধুকে স্মরণ করে তাঁর আবেগঘন উদযাপনও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চার ম্যাচ শেষে পাজের নামের পাশে রয়েছে তিনটি গোল ও পাঁচটি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ গোল করা এবং গোলে সরাসরি সহায়তা—দুই ক্ষেত্রেই দলের আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এই তরুণ। মোট আটটি গোল-অবদানের হিসাব তাঁকে প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোল কন্ট্রিবিউটরদের শীর্ষে নিয়ে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিযোগিতার সামগ্রিক পরিসংখ্যান ও অন্য খেলোয়াড়দের হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে এই অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর হয়ে পাজের এই পারফরম্যান্স বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কোচ সেস ফ্যাব্রিগাসের অধীনে দলটি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করছে। সেই কৌশলে পাজের সৃজনশীলতা, বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সাজানোর পাশাপাশি নিজেও গোলের জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার সামর্থ্য তাঁকে দলের জন্য বহুমাত্রিক খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
লঁসের মাঠে স্বাগতিকদের বিপক্ষে কোমোর ৯-১ গোলের জয় ছিল চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ম্যাচটিতে শুধু বড় ব্যবধানের জয়ই নয়, আক্রমণাত্মক ফুটবলের এক দুর্দান্ত প্রদর্শনী দেখিয়েছে ইতালির ক্লাবটি। সেই জয়ে পাজের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজে একটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও দুটি গোল করিয়েছেন। ফলে ম্যাচের তিনটি গোলে সরাসরি অবদান রাখেন আর্জেন্টাইন এই মিডফিল্ডার।
ম্যাচের ৪০ মিনিটে গোল করেন পাজ। পেনাল্টি বক্সের ভেতরে বল পেয়ে শক্তিশালী শটে প্রতিপক্ষের জাল খুঁজে নেন তিনি। গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে প্রচলিত উদযাপনে না গিয়ে ছুটে যান বদলি খেলোয়াড়দের বেঞ্চের দিকে। সেখান থেকে একটি বিশেষ টি-শার্ট হাতে নিয়ে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরেন। শার্টটিতে ছিল স্প্যানিশ ফুটবলার প্রয়াত হেসুস দে মিগেলের সাদা-কালো ছবি। এর মাধ্যমে বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।
লঁসের বিপক্ষে পাজের গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট কোমোর বড় জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে তাঁর পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন কেবল গোলের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আক্রমণের বিভিন্ন পর্যায়ে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখা, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রেও তিনি কার্যকর ছিলেন। বড় ব্যবধানের জয়ের ম্যাচেও তাঁর ব্যক্তিগত অবদান আলাদা করে নজর কেড়েছে।
এর আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষেও অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন পাজ। নিজেদের মাঠে ইংলিশ ক্লাবটিকে ৪-১ গোলে হারায় কোমো। সেই ম্যাচে পাজ করেন দুটি গোল এবং সতীর্থকে দিয়ে করান আরও একটি। ম্যাচের শুরুতেই তাঁর গোল দলকে এগিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে আক্রমণে তাঁর উপস্থিতি ও সৃজনশীলতা কোমোকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অভিষেকের পর থেকেই আলোচনায় থাকা দলটির জন্য এই জয় ছিল বড় অর্জন।
জার্মানির ক্লাব আরবি লাইপজিগের বিপক্ষেও পাজের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। কোমোর ৪-১ গোলের জয়ে দুটি গোলে সহায়তা করেন তিনি। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরির পাশাপাশি সতীর্থদের সঠিক সময়ে বল সরবরাহ করার দক্ষতা ওই ম্যাচে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক খুঁজে বের করা এবং সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা দলের আক্রমণকে আরও কার্যকর করেছে।
তবে সব ম্যাচেই যে পাজ একই রকম সফল হয়েছেন, তা নয়। ডাচ ক্লাব ফেয়েনুর্ডের বিপক্ষে ৩-২ গোলে হারের ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট—কোনোটিতেই অবদান রাখতে পারেননি তিনি। ফুটবলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যে কঠিন, এই ম্যাচ তারই উদাহরণ। কিন্তু একটি ম্যাচে নিষ্প্রভ থাকলেও পরবর্তী ম্যাচগুলোতে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করে আবারও আলোচনায় ফিরেছেন এই তরুণ।
চার ম্যাচে তিন গোল ও পাঁচ অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান তাঁর সামগ্রিক অবদানের একটি ধারণা দেয়। বিশেষ করে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করেছে। একজন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের কাছ থেকে দল যে ধরনের সৃজনশীলতা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করে, পাজের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তবে মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। সামনে আরও ম্যাচ থাকায় এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে তাঁকে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরে পাজের উদযাপনের মুহূর্তটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রয়াত হেসুস দে মিগেলের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা জানানোর ঘটনাটি ফুটবলকে ঘিরে থাকা মানবিক সম্পর্কের কথাও সামনে এনেছে। একজন খেলোয়াড়ের কাছে গোল করা যেমন আনন্দের, তেমনি সেই আনন্দের মুহূর্তে প্রিয় কাউকে স্মরণ করা গভীর আবেগের বিষয়। পাজের এই আচরণে সেই অনুভূতিরই প্রকাশ ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দে মিগেলের মৃত্যুর ঘটনায় স্প্যানিশ ফুটবল অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। গুরুতর আঘাতের পর তাঁর মৃত্যুর খবর সতীর্থ, ক্লাব ও সমর্থকদের মধ্যে শোক ছড়িয়ে দেয়। ফুটবল মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহমর্মিতা যে কতটা গভীর হতে পারে, এমন ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দে মিগেলের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁর বক্তব্যে বন্ধুর পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি প্রয়াত ফুটবলারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ফুটে ওঠে। এরপর লঁসের বিপক্ষে গোল করে বিশেষ টি-শার্ট প্রদর্শনের মাধ্যমে সেই শ্রদ্ধাকে মাঠের উদযাপনের অংশ করে নেন তিনি। গোলের পর এমন আবেগঘন আচরণ স্বাভাবিকভাবেই দর্শক ও ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
পাজের এই উদযাপন মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবল কেবল ফলাফল, গোলসংখ্যা কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের খেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের সম্পর্ক, স্মৃতি, আনন্দ-বেদনা এবং সহমর্মিতা। একজন খেলোয়াড় যখন নিজের সাফল্যের মুহূর্তে প্রয়াত বন্ধুকে স্মরণ করেন, তখন সেই দৃশ্য খেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর মানবিক অনুভূতির জায়গায় পৌঁছে যায়।
নিকো পাজের সামনে এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বাকি ম্যাচগুলোতে নিজের পারফরম্যান্স ধরে রাখা এবং কোমোকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেওয়াই হবে তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তরুণ এই আর্জেন্টাইন মাঝমাঠের খেলোয়াড় ইতোমধ্যে দেখিয়েছেন, বড় মঞ্চে চাপ সামলে দলকে কীভাবে সহায়তা করতে হয়। তাঁর গোল, অ্যাসিস্ট ও সৃজনশীল ফুটবল কোমোর আক্রমণকে শক্তিশালী করছে। একই সঙ্গে প্রয়াত বন্ধুর স্মরণে তাঁর আবেগঘন উদযাপন প্রমাণ করেছে, মাঠের বাইরের সম্পর্ক ও স্মৃতিও একজন খেলোয়াড়ের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পাজের এই উত্থান তাই দুই দিক থেকেই আলোচিত—একদিকে অসাধারণ ফুটবলীয় দক্ষতা, অন্যদিকে বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ। গোলের পরিসংখ্যান হয়তো সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে, প্রতিযোগিতার শীর্ষস্থানেও আসতে পারেন অন্য কেউ। কিন্তু একটি বড় জয়ের রাতে বন্ধুকে স্মরণ করার সেই মুহূর্ত ফুটবলপ্রেমীদের মনে আলাদা জায়গা করে নিতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত