অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপির প্রয়াত নেতা সাদেক হোসেন খোকার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর কবরে শ্রদ্ধা জানিয়ে জিয়ারত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম। বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর জুরাইনে অবস্থিত সাদেক হোসেন খোকার কবর জিয়ারত করেন তিনি। এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর কবর জিয়ারতের এই আয়োজন প্রয়াত নেতার রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা এবং রাজধানী ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থানকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী জাতীয় রাজনীতি এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের নেতৃত্ব—বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা ছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর পরিচয় এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
বুধবার জুরাইনে কবর জিয়ারতের সময় সাদিক কায়েমের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর শ্যামপুর দক্ষিণ থানার আমির কামরুল আহসান, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ শেখ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা প্রয়াত নেতার কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে এ ধরনের স্মরণ কর্মসূচি রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রয়াত ব্যক্তিদের অবদান ও তাঁদের জীবনের বিভিন্ন দিক নতুন করে স্মরণ করার সুযোগ তৈরি করে।
কবর জিয়ারত শেষে সাদিক কায়েম বলেন, সাদেক হোসেন খোকা মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে খোকার অবদান জাতি স্মরণ রাখবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনি রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে পরাজিত করার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকায় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রয়াত এই নেতা।
সাদিক কায়েমের বক্তব্যে সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, ঢাকা শহরের নির্বাচনি রাজনীতি এবং জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন ডাকসু ভিপি। তবে এসব রাজনৈতিক মূল্যায়ন তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবে বিবেচ্য; প্রয়াত নেতার সামগ্রিক রাজনৈতিক ভূমিকা বুঝতে হলে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিভিন্ন সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সাদেক হোসেন খোকা ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিচিত অধ্যায়ের অবসান ঘটে। ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি ঢাকার নগর প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে তাঁর সময়কাল রাজধানীর নগর রাজনীতির আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সাদেক হোসেন খোকা স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, নির্বাচন এবং দলীয় নেতৃত্বের নানা অভিজ্ঞতা যুক্ত ছিল।
ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি বিশেষভাবে বিস্তৃত হয় মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়। রাজধানীর নগর প্রশাসন, নাগরিক সেবা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং নগর পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে নগর রাজনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসে। মেয়র হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে সমর্থন ও সমালোচনা—দুই ধরনের মূল্যায়নই রয়েছে, যা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক ভূমিকা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক।
জাতীয় রাজনীতিতেও সাদেক হোসেন খোকা সক্রিয় ছিলেন। বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় কর্মসূচি, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনেও তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী শুধু ব্যক্তিগত স্মরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি সময় ও নানা আন্দোলনের স্মৃতিও সামনে নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুবার্ষিকী সাধারণত তাঁদের কর্মজীবন, অবদান, বিতর্ক এবং ঐতিহাসিক ভূমিকা মূল্যায়নের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সাদেক হোসেন খোকার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা, নগর প্রশাসক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে স্মরণ করেন। অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে এসব ভিন্ন মূল্যায়ন ইতিহাসের অংশ হিসেবে আলোচনার সুযোগ রাখে।
সাদিক কায়েমের কবর জিয়ারত সেই স্মরণপ্রক্রিয়ারই একটি ঘটনা। একজন ছাত্রনেতার পক্ষ থেকে সাবেক মেয়র ও মুক্তিযোদ্ধার কবর জিয়ারত রাজনৈতিক প্রজন্মের মধ্যে অতীতের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি ও ভূমিকা নিয়ে আগ্রহের বিষয়টিও সামনে আনে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানাশোনা এবং বিভিন্ন সময়ের নেতৃত্বের অবদান পর্যালোচনা করা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চর্চার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁর নাম ফিরে আসে বিভিন্ন উপলক্ষে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ, ঢাকা নগর প্রশাসন এবং বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গে তাঁর ভূমিকা আলোচিত হয়। জুরাইনে তাঁর কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করলেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও উপস্থিত ব্যক্তিরা। প্রয়াত এই নেতার জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও তাঁর অবদান ও বিতর্ক—উভয় দিকই তথ্যনির্ভরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত