উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুল, অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে যেসব পরীক্ষকের উত্তরপত্র মূল্যায়নের দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে, তাঁদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ফলাফল নিশ্চিত করতে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পাশাপাশি পুরো মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা চিহ্নিত করার কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর ডেমরায় সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুলের কারণে যেন শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিচ্ছে। মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা দূর করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। আর দায়িত্বে অবহেলা কিংবা ভুল মূল্যায়নের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরীক্ষার ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রস্তুতি এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের অনেক সিদ্ধান্ত। ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়নে সামান্য ভুলও কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী যথাযথ নম্বর পাওয়ার পরও ভুল মূল্যায়নের কারণে অকৃতকার্য হলে কিংবা প্রত্যাশার চেয়ে কম গ্রেড পেলে তা তার জন্য হতাশা ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় খাতা মূল্যায়নের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুনর্নিরীক্ষণের পর প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছেন। এ ছাড়া নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৯ জন। পুনর্নিরীক্ষণের পর এতসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফলে পরিবর্তন আসার বিষয়টি উত্তরপত্র মূল্যায়নব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসি পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দুর্বলতা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। কোন পর্যায়ে ভুল হচ্ছে, পরীক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি কোথায় এবং কীভাবে এসব সমস্যা কমানো যায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু ফলাফল প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীরা যেন তাদের প্রকৃত অর্জনের ভিত্তিতে নম্বর ও গ্রেড পায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
এ জন্য পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ, নম্বর প্রদানের সামঞ্জস্য এবং সঠিকভাবে উত্তর যাচাই করার দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কার্যকর হতে পারে। তবে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পরীক্ষক দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কি না, ভুলটি অনিচ্ছাকৃত নাকি দায়িত্বহীনতার ফল—এসব বিষয় যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
এদিকে এইচএসসি পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরীক্ষার সময়সূচিও জানিয়েছেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, এসব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা আগামী ২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে ২৩ ডিসেম্বর। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের যেন পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে না হয়, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাধারণত কোনো শিক্ষার্থী এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে তার উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা এবং ব্যক্তিগত পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা দ্রুত ঘাটতি পূরণের সুযোগ পাবেন। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এইচএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন গ্রহণ করা হবে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত। শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ করা হবে ২৩ নভেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রমের সময় বিবেচনায় রেখে দ্রুত ফল প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ, ফলাফলে পরিবর্তন হলে কোনো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষায় ভর্তির যোগ্যতা বা আবেদনের সুযোগ বদলে যেতে পারে। সময়মতো পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ করা গেলে শিক্ষার্থীরা ভর্তি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন।
এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শিক্ষামন্ত্রী জানান, পুনর্নিরীক্ষণের পর যাঁদের ফল পরিবর্তন হয়ে পাস হবে, তাঁরা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে পুনর্নিরীক্ষণের পরও যাঁরা অকৃতকার্য থাকবেন, তাঁরা ভর্তি হতে পারবেন না। অর্থাৎ ভর্তি-যোগ্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও চূড়ান্ত ফলাফলই বিবেচনায় থাকবে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই বিতরণের বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বই ইতিমধ্যে জেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিসেম্বরের যেকোনো দিন নতুন বই বিতরণ করা হবে। তবে শিক্ষার্থীরা যেদিন পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে বাড়ি ফিরবে, সেদিনই তাদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছে দেওয়া শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান যেন বইয়ের অভাবে ব্যাহত না হয়, সে জন্য আগেভাগে বই সরবরাহের প্রস্তুতি প্রয়োজন। জেলা পর্যায়ে বই পৌঁছানোর পর বিদ্যালয়ভিত্তিক বিতরণব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্পন্ন করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা তুলে ধরেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, চীনের সহযোগিতায় দেশের কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ দেশের আট বিভাগে আটটি এবং কক্সবাজারে একটি—মোট নয়টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে চীনা কারিকুলাম, আধুনিক ল্যাব, শিক্ষক এবং ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কারিকুলাম তৈরি ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াতেও চীনের অংশগ্রহণ থাকবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া দেশের প্রায় ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষাশিক্ষা চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা বিবেচনায় ভাষাশিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব কর্মসূচির সুফল পেতে প্রশিক্ষণের মান, শিক্ষকদের প্রস্তুতি, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা অর্জনের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্মার্ট ক্লাসরুম ও ল্যাব স্থাপনের কাজ শুরু হবে। শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি নেওয়া হবে, যা সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে এ কর্মসূচির কাজ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে পাঠদান আরও তথ্যনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু স্মার্ট ক্লাসরুম বা ট্যাব সরবরাহ করলেই শিক্ষার মান বাড়বে না; এসব প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে জবাবদিহি, পুনর্নিরীক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত ফল নিশ্চিত করা, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পরীক্ষার সুযোগ, সময়মতো পাঠ্যবই বিতরণ এবং কারিগরি ও প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এসব ঘোষণার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত তদারকির ওপর। বিশেষ করে খাতা মূল্যায়নে ভুলের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই এখন শিক্ষা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত