গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পর আদালতে পরীমনি, চান জামিন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পর আদালতে পরীমনি, চান জামিন
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি আদালত এলাকায় পৌঁছান। আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সময় না পাওয়া পর্যন্ত নিজস্ব গাড়ির ভেতরে অবস্থান করছেন তিনি। এ সময় তাঁর গাড়ির চারপাশে কয়েকজন দেহরক্ষীকেও দেখা যায়। মামলাটিকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই অভিনেত্রী।

পরীমনির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত (সুরভী) বৃহস্পতিবার সকালে জানান, আগের দিন ৪ নভেম্বর ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমানের আদালত পরীমনি ও তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি ওরফে জিমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পরীমনি স্বেচ্ছায় আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ এবং জামিনের আবেদন করতে এসেছেন।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতের নির্ধারিত সময় পেলে পরীমনি এজলাসে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করবেন এবং জামিন চাইবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালত পরীমনির জামিন মঞ্জুর করবেন। তবে জামিনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। শুনানি শেষে বিচারক কী আদেশ দেন, সেটিই এখন মামলার পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

গত বুধবার আদালত পরীমনি ও তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জিমির পক্ষে করা সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করেন। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। একই সঙ্গে মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আগামী ২৩ ডিসেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। আদালতের এই আদেশের পরদিনই পরীমনির স্বেচ্ছায় হাজির হওয়ার ঘটনা মামলাটিতে নতুন অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মামলাটির সূত্রপাত ২০২২ সালের ৬ জুলাই। ওই দিন নাসির উদ্দিন ঢাকার আদালতে পরীমনি ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে মারধর, ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা করেন। মামলার এজাহারে সাভারের একটি ক্লাবে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়। অভিযোগকারী দাবি করেন, ২০২১ সালের ৯ জুন রাতের ওই ঘটনায় তাঁর সঙ্গে পরীমনি ও তাঁর সহযোগীদের বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয় এবং ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, ৯ জুন রাত ১২টার পর পরীমনি ও তাঁর সহযোগীরা সাভারের বোট ক্লাবে যান। তাঁরা ক্লাবের দ্বিতীয় তলার ওয়াশরুম ব্যবহার করেন এবং পরে ক্লাবের ভেতরে বসে অ্যালকোহল পান করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। বাদী নাসির উদ্দিন এবং তাঁর সহযোগী শাহ শহিদুল আলম রাত সোয়া ১টার দিকে ক্লাব থেকে বের হওয়ার সময় পরীমনি তাঁদের ডাকেন এবং কিছু সময় বসার অনুরোধ জানান বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে পরীমনি ক্লাবের একটি ব্লু লেবেল অ্যালকোহলের বোতল বিনা মূল্যে পার্সেল দেওয়ার জন্য নাসির উদ্দিনকে চাপ দেন। নাসির উদ্দিন এতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। এ সময় তাঁকে গালমন্দ করা হয় এবং একপর্যায়ে একটি সার্ভিং গ্লাস ও হাতে থাকা মোবাইল ফোন তাঁর দিকে ছুড়ে মারা হয় বলে অভিযোগকারীর দাবি। এতে নাসির উদ্দিন মাথা ও বুকে আঘাত পান বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

এজাহারে পরীমনি ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে মারধর, ভাঙচুর এবং হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে এগুলো মামলার বাদীর করা অভিযোগ, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণের বিষয়। অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা মামলা এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। তাই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে বিচারাধীন বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার পরিদর্শক মো. মনির হোসেন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে পরীমনি ও তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে আনা মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে একই মামলার আরেক আসামি ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়।

পরবর্তী সময়ে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। গত বছরের ২৬ জানুয়ারি একই আদালত অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর থেকে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ার মধ্যেই গত ৪ নভেম্বর সময়ের আবেদন নামঞ্জুর এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ আসে।

এই মামলার পাশাপাশি ২০২১ সালের জুনে বোট ক্লাবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি মামলাও আলোচনায় আসে। পরীমনি সাভার থানায় নাসির উদ্দিনসহ দুজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ওই মামলাটি বর্তমানে ঢাকার ৯ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। একই ঘটনাকে ঘিরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং পৃথক বিচারিক কার্যক্রম বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে।

দুটি মামলার অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়া আলাদা। এক মামলায় এক পক্ষের অভিযোগের তদন্ত বা বিচার চলার অর্থ অন্য মামলার অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য, প্রমাণ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনা করে আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় সব পক্ষের বক্তব্য উপস্থাপন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পরীমনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত মুখ। তাঁর অভিনয়জীবন ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে চলমান মামলাটি তাঁর পরিচিতি বা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নয়, বরং অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে মামলার বাদী ও সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যও যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

এখন মামলার তাৎক্ষণিক গুরুত্ব জামিন আবেদনের শুনানি ও আদালতের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। পরীমনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইবেন বলে তাঁর আইনজীবী জানিয়েছেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন। একই সঙ্গে আগামী ২৩ ডিসেম্বর নির্ধারিত সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখে মামলার বিচারিক কার্যক্রম কীভাবে এগোয়, সেদিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।

দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা এই মামলার পরবর্তী ধাপগুলোতে নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের আদেশের মধ্য দিয়েই পরীমনির জামিনের আবেদন এবং মামলার পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com