দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও নানা জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে আবারও পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে কক্সবাজার থেকে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে। নতুন পর্যটন মৌসুমের প্রথম দিনেই আট শতাধিক যাত্রী নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করেছে এমভি বার আউলিয়া। বৃহস্পতিবার সকালে জাহাজটির যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন অনেক পর্যটক। তবে যাত্রার প্রথম দিনেই টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি, অনলাইন টিকিট কেনার পরও ভোগান্তি এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্যদিকে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স বহনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ঘাট থেকে এমভি বার আউলিয়া সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। জাহাজটিতে আট শতাধিক পর্যটক ছিলেন। নির্ধারিত যাত্রার বেশ আগেই ভোর ৬টা থেকে ঘাটে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ দলগত ভ্রমণের অংশ হিসেবে দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নেন। দীর্ঘদিন পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় ঘাট এলাকায় সকাল থেকেই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণ বাংলাদেশের পর্যটনপ্রেমীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ আকর্ষণের। নীল জলরাশি, প্রবালসমৃদ্ধ সামুদ্রিক পরিবেশ, সৈকত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ দ্বীপটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটক নিয়ন্ত্রণ এবং নৌযান চলাচল নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণপ্রত্যাশীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ফলে নতুন মৌসুমে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠেছে।
জাহাজ চলাচলের প্রথম দিন থেকেই পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঘাটে তৎপর ছিলেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা ঘাটে দায়িত্ব পালন করেন। পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স জাহাজে নিতে বাধা দেওয়া হয়। পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়। যাত্রীদের জানানো হয়, সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভ্রমণের সময় প্রত্যেককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, মৌসুমের প্রথম দিনে আট শতাধিক যাত্রী নিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এর মধ্য দিয়ে পর্যটন মৌসুম ঘিরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটছে। জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। দ্বীপের কেয়াবনে প্রবেশ, ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়া, পার্টি আয়োজন এবং উচ্চ শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ রয়েছে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকেও পর্যটকদের বিরত থাকতে হবে। তিনি জানান, পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য সামগ্রী ঘাটে নির্ধারিত স্থানে জমা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি সাউন্ডবক্সও পর্যটকদের কাছ থেকে নিয়ে জাহাজ মালিকদের কাছে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের জন্য তিনি পর্যটকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান।
পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম জানান, প্রথম দিনে প্রায় ৮০০ টিকিট বিক্রি হয়েছে। জাহাজটির মোট যাত্রী ধারণক্ষমতার তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তাঁর মতে, পর্যটকদের পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন করা এবং নিষিদ্ধ সামগ্রী বহন না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে ঘাটে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন রাখার পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ যেন না পড়ে, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।
প্রথমবার সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন পর্যটক পপি সাবরিন জেসি। তিনি জানান, এর আগে কখনো দ্বীপটিতে যাওয়া হয়নি। এবার মৌসুমের প্রথম দিনেই ভ্রমণের সুযোগ পাওয়ায় তাঁর আনন্দ ও উত্তেজনা অনেক বেশি। তবে তাঁর এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অফিসারদের একটি দলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি গাইড হিসেবেও দ্বীপে যাচ্ছেন। প্রথমবারের মতো দেশের আকর্ষণীয় এই দ্বীপ দেখার প্রত্যাশা তাঁর অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
তবে সব পর্যটকের অভিজ্ঞতা যে সমান স্বস্তিদায়ক ছিল, তা নয়। যাত্রার প্রথম দিনেই টিকিটের দাম বৃদ্ধি ও টিকিট কেনার পরও ভোগান্তির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন যাত্রী। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক হৃদয় জানান, অনলাইনে টিকিট কেনার পরও তাঁদের হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এবার সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ৪ হাজার ২০০ টাকা, যেখানে আগে তা ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ টিকিটপ্রতি ৭০০ টাকা বেড়েছে। ভ্রমণের খরচ বাড়ার পাশাপাশি টিকিট ব্যবস্থাপনায় ভোগান্তি থাকায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, অনলাইনে টিকিট কেনার পরও যদি যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ পর্যটকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পর্যটকদের এই অভিযোগ নতুন মৌসুমের শুরুতেই ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় পর্যটক নিয়ন্ত্রণ ও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ জরুরি হলেও একই সঙ্গে টিকিট বিক্রি, যাত্রীসেবা, ঘাটে প্রবেশ এবং জাহাজে ওঠার প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণপ্রত্যাশীরা যাতে আগে থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পান এবং নির্ধারিত মূল্যে নির্বিঘ্নে যাত্রা করতে পারেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অন্যদিকে দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের নেওয়া উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. এস এম মোজাম্মেল হোসেন। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিন পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীপ। এর জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে পর্যটকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তাঁর বক্তব্যে দ্বীপটির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সেটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন স্কোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি জাহাজ। এগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজের সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ায় ৮৫০ জন, এমভি কর্ণফুলিতে ৭৩২ জন এবং এমভি টেকনাফে ৭১৬ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বার আউলিয়া সকাল ৭টায়, এমভি কর্ণফুলি সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে এবং এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা। ফিরতি পথে জাহাজ তিনটি যথাক্রমে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট, দুপুর ২টা ১৫ মিনিট এবং বিকেল সাড়ে ৩টায় সেন্টমার্টিন ঘাট ছাড়বে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ সময় দ্বীপে ভ্রমণের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। দ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ভ্রমণের ক্ষেত্রে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দ্বীপের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দ্বীপে আরও কিছু বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকতে হবে। এসব বিধিনিষেধের মূল লক্ষ্য দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ ও সংবেদনশীল সামুদ্রিক পরিবেশকে পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখা।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনকে ঘিরে পর্যটন মৌসুমে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য তৈরির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পর্যটন কার্যক্রমের প্রসারের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে এবারের মৌসুমের বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি এবং জাহাজ পরিচালনায় সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এর জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত