সরকারের ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও অযোগ্যতা আড়াল করতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পরিবর্তে সরকার বিরোধীদের চরিত্রহননে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি সরকারকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করে দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিরোধী দলের প্রতিবাদী কণ্ঠ দমনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। দলের সহযোগী সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের কারামুক্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দেন। প্রায় এক মাস কারাভোগের পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে মঙ্গলবার সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান আখতারুজ্জামান। তাঁর মুক্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জামায়াতের নেতাকর্মী ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে সরকারের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, বিরোধী দলের চরিত্রহনন এবং তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত নিজেদের ব্যর্থতা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করা। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে পারলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সরকারকে সমর্থন করবে। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, অতীতের মতো কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতিতে প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করলে তা সফল হবে না। তাঁর ভাষায়, কেউ যদি মনে করেন আগের স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী মত ও প্রতিবাদ দমন করা সম্ভব, তাহলে সেটি হবে ভুল ধারণা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানি কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। গত ১ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফেরেন। বিমানবন্দরে তাঁদের লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়াকে কেন্দ্র করে আখতারুজ্জামানের সঙ্গে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের কথা-কাটাকাটি হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগে মামলা করা হয়। গত ২ অক্টোবর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁকে রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছিল।
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, বিমানবন্দরে তিনি প্রতিবাদ করলেও কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছে। শফিকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সেবার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে আখতারুজ্জামান যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেসব সমস্যা সমাধানে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে তিনি বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন।
জামায়াত আমিরের দাবি, আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর বিমানবন্দরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। দুই দফায় নতুন লাগেজ ট্রলি সংযোজন, লাগেজ বেল্ট এলাকায় ক্যামেরা স্থাপন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিমানবন্দরের সেবার মান ও জবাবদিহি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিমানবন্দরের লাগেজ ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের যাত্রীসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশি-বিদেশি যাত্রীদের দীর্ঘ ভ্রমণের পর নির্ধারিত সময়ে লাগেজ হাতে পাওয়া প্রত্যাশিত হলেও বিভিন্ন সময়ে লাগেজ পেতে বিলম্ব, ট্রলি সংকট এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের চাপ বেশি থাকলে এসব সমস্যার কারণে ভোগান্তি বাড়ে। লাগেজ হারানো বা বিলম্বিত হওয়ার ঘটনায় যাত্রীদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার পাশাপাশি ভ্রমণসূচিও ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং কর্মীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিমানবন্দরের সমস্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি আইন ভঙ্গ করেছেন কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মামলার অভিযোগ, তদন্তের তথ্য এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বিষয়টির চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে জামায়াত নেতারা আপত্তি জানালেও মামলার আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাঁর জামিনের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে।
আখতারুজ্জামান রিমান্ডে থাকাকালে গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, রিমান্ডে নেওয়ার পর চোখ বেঁধে তাঁকে জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। এসব প্রশ্নের সঙ্গে বিমানবন্দরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও নেতৃত্বের বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের প্রশ্ন করার এখতিয়ার নিয়েও তিনি আপত্তি জানান।
আখতারুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করা। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, নেতৃত্বের কার্যক্রম কিংবা সাংগঠনিক বিষয়ে প্রশ্ন করার প্রয়োজনীয়তা কী, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত অধিকারের বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
তবে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় কী ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল এবং সেগুলো মামলার তদন্তের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত ছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নির্ধারণে যথাযথ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
গত সোমবার হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর মঙ্গলবার সকালে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান আখতারুজ্জামান। তাঁর মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। কারাফটকে তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা উত্তর মহানগর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন এবং ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামাল হোসেনসহ অন্য নেতারা।
আখতারুজ্জামানের মুক্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই সংবর্ধনা শুধু একজন নেতার কারামুক্তিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর অধিকার এবং সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
এদিকে মঙ্গলবার সকালে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনার ডেরেক লোহ। তাঁদের মধ্যে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে এ ধরনের সাক্ষাৎ দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে।
সামগ্রিকভাবে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সরকারের প্রতি বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে অসন্তোষ স্পষ্ট হয়েছে। সরকারকে নিজেদের কার্যক্রমের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জনস্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং মুক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অধিকার ও আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুস্থ রাখতে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বিরোধ যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা হয়রানিতে রূপ না নেয়, একই সঙ্গে আইনগত অভিযোগের বিচার যেন যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়—এটাই এখন জনগণের প্রত্যাশা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত