এলপিজির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
এলপিজির দরবৃদ্ধিতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। দলটির নেতারা মনে করছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে নতুন করে এলপিজির দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য রান্নার জ্বালানির ব্যয় মেটানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, বাজারে কার্যকর তদারকি এবং ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের প্রবণতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে দলটি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক বিবৃতিতে দলের পক্ষ থেকে এই প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ব্যবসায়ীদের চাপ ও স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সরকার এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, জ্বালানির মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সাইফুল হক বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক পরিবার। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন ব্যয় এবং চিকিৎসা খরচের চাপ যুক্ত হয়েছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের সমন্বয় করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি এলপিজির দাম বাড়ানো হলে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশে নগরাঞ্চলের অসংখ্য পরিবার রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নেই, সেখানে রান্নার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে সিলিন্ডার গ্যাস। শুধু শহরেই নয়, দেশের বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকাতেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে এই জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সমাজের বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে। একটি পরিবারের মাসিক বাজেটে রান্নার জ্বালানি একটি অপরিহার্য খরচ হওয়ায় দাম বৃদ্ধির প্রভাব সহজেই এড়ানোর সুযোগ থাকে না।

বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন। যেসব পরিবার মাসের শুরুতেই বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ রাখে, তাদের ক্ষেত্রে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়লে অন্য খাতের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। অনেক পরিবারকে তখন খাদ্যাভ্যাস, যাতায়াত কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করতে হয়। ফলে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধিকে কেবল একটি পণ্যের দাম বাড়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে।

বিবৃতিতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এলপিজির দাম সমন্বয় করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার বিষয়টি সামনে এনে দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সাধারণ ভোক্তারা একইভাবে তার সুফল পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছতা নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পুরো চাপ কেন ভোক্তাদের বহন করতে হবে এবং দাম কমার সুবিধা কেন সমানভাবে তাদের কাছে পৌঁছাবে না।

এলপিজির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, জাহাজভাড়া, ডলারের বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন স্থানীয় বাজারে প্রভাব ফেলে। এসব উপাদানের ভিত্তিতে বিইআরসি নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে। তবে মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই বাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্ধারিত মূল্য এবং বাস্তবে ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের মধ্যে অনেক সময় পার্থক্যের অভিযোগ পাওয়া যায়। কোথাও নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না, আবার কোথাও পরিবহন বা সরবরাহ সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। ফলে শুধু কাগজে-কলমে মূল্য নির্ধারণ করলেই ভোক্তাদের স্বার্থ নিশ্চিত হয় না। বাজারের প্রতিটি পর্যায়ে নির্ধারিত দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এই পরিস্থিতিতে এলপিজি ব্যবসায়ীদের কমিশন ও মুনাফার নামে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানো বন্ধের দাবি জানিয়েছে। দলটির মতে, জ্বালানির বাজারে ব্যবসায়িক স্বার্থের অজুহাতে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের সুযোগ থাকলে সাধারণ মানুষকে বারবার তার মূল্য দিতে হবে। এ জন্য সরকার ও বিইআরসিকে বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে এলপিজি আমদানি, বিপণন, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হলে আমদানিনির্ভরতা, ডলারের বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। আবার ডলারের বিনিময় হার বাড়লেও একই পরিমাণ এলপিজি আমদানিতে দেশীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এসব কারণে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে সেই সমন্বয় কতটা যুক্তিসংগত, আমদানিকারকদের প্রকৃত ব্যয় কত এবং বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে বিইআরসির পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়, কৃত্রিম সংকট তৈরি, সরবরাহে অনিয়ম কিংবা মজুতদারির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সহজ করা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করলে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা হতে পারে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখন সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং গৃহস্থালি রান্নার সঙ্গে জ্বালানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এলপিজির দাম বাড়লে রেস্তোরাঁ, হোটেল, খাবারের দোকান এবং ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসার পরিচালন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারে। ফলে একটি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরোক্ষভাবে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের বক্তব্যে মূলত এই সামগ্রিক জনদুর্ভোগের বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে। দলটির দাবি, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা না করে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ভোক্তাদের অধিকার ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিবাদ দেশের জ্বালানি বাজারের স্বচ্ছতা, মূল্য নির্ধারণের নীতি এবং ভোক্তা অধিকার রক্ষার প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে। তবে এই বিতর্কের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন আমদানি ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য সমন্বয়, ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি এবং বাজার তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানির মতো মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সাধারণ মানুষের সামর্থ্য ও জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। কারণ রান্নার জ্বালানির বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে পরিবারের খাবারের টেবিল, মাসিক বাজেট এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপরই প্রভাব ফেলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com