বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে নিজের অভিনয়দক্ষতা, সৌন্দর্য ও পরিশ্রম দিয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম। ছোট পর্দায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর শোবিজে পথচলা। এরপর নাটক, বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রে কাজ করে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে। আজ তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য দর্শকপ্রিয় সিনেমা, পুরস্কার ও বাণিজ্যিক সাফল্য। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, সংগ্রাম এবং শুরুর দিনগুলোর নানা অভিজ্ঞতা। অভিনয়জীবনের প্রথম পারিশ্রমিক ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই মিমই এখন একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ১৫ লাখ টাকার বেশি পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন বলে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে।
মিমের অভিনয়জীবনের শুরুর গল্পের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের নাম। তাঁর পরিচালিত একটি নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই প্রথম পারিশ্রমিক পাওয়ার অভিজ্ঞতা হয় এই অভিনেত্রীর। সেই সম্মানীর পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার টাকা। অর্থের অঙ্কে এটি খুব বড় কিছু না হলেও মিমের কাছে এর আবেগ ও স্মৃতির মূল্য অনেক বেশি। কারণ, অভিনয়জীবনের প্রথম উপার্জন হিসেবে এই অর্থ তাঁর কাছে বিশেষ হয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে তাঁর পেশাগত অবস্থান বদলেছে, পারিশ্রমিক বেড়েছে বহুগুণ, কিন্তু শুরুর সেই স্মৃতি এখনো যত্নে ধরে রেখেছেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে মিম জানিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম সম্মানীর টাকা তিনি এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। প্রথম উপার্জনের পাঁচ হাজার টাকা তিনি মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। একজন নতুন শিল্পীর কাছে প্রথম পারিশ্রমিক শুধু অর্থনৈতিক প্রাপ্তি নয়, বরং নিজের কাজের স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দও। মিমের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ছিল তেমন। অভিনয়ের জগতে তখন তিনি একেবারেই নতুন। সামনে কী অপেক্ষা করছে, কতটা সফল হতে পারবেন কিংবা দর্শকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবেন, সেসব প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না। কিন্তু প্রথম কাজের সম্মানী তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মিমের শোবিজে প্রবেশের পথ তৈরি হয়েছিল ২০০৭ সালে। ওই বছর তিনি অংশ নেন ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায়। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার পর তাঁর সামনে খুলে যায় বিনোদন অঙ্গনের নতুন সম্ভাবনার দরজা। তবে এই সাফল্য একদিনে আসেনি। মিডিয়ায় কাজ করার আগ্রহ নিয়ে তাঁকে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করতে হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি বিভিন্নভাবে সুযোগ খুঁজেছেন। শুরুতে অভিনয়ের প্রস্তাব এলেও সব ধরনের চরিত্রে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না মিম। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা এবং নিজের পরিচয় একজন অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
শুরুর দিকে অভিনেতা জাহিদ হাসানের বোনের চরিত্রে অভিনয়ের একটি প্রস্তাবও পেয়েছিলেন তিনি। তবে সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তখন হয়তো তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা আলোচনা হতে পারত, কিন্তু নিজের অভিনয়জীবন সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল মিমের। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। যে অভিনেতার বিপরীতে একসময় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন, সেই জাহিদ হাসানই পরে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের সহশিল্পী হন। ঘটনাটি তাঁর অভিনয়জীবনের শুরুর সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য স্মৃতি।
মিমের বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে ২০০৮ সালে। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় ‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে যাত্রা শুরু করেন তিনি। নতুন অভিনেত্রী হিসেবে এমন একজন প্রতিষ্ঠিত নির্মাতার সিনেমায় কাজ করার সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় প্রভাব ফেলেছিল। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয়ের সময় তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত। অন্যদিকে সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন দেশের পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত অভিনয়শিল্পীরা। স্বাভাবিকভাবেই নতুন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে তাঁর মধ্যে কিছুটা জড়তা ছিল। তবে হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে সেই অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছিলেন বলে পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণায় জানিয়েছেন মিম।
‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রটি মিমের অভিনয়জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে আছে। বড় পর্দায় প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে অভিনয়ের নতুন জগৎ চিনতে সাহায্য করে। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে ক্যামেরার সামনে উপস্থিতি, সংলাপ বলার ধরন, চরিত্রের আবেগ প্রকাশ এবং সহশিল্পীদের সঙ্গে সমন্বয়—সবকিছুই ছিল শেখার বিষয়। শুরুতেই অভিজ্ঞ নির্মাতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় এসব বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি তিন লাখ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। পাঁচ হাজার টাকার প্রথম সম্মানী থেকে তিন লাখ টাকার চলচ্চিত্র পারিশ্রমিক—এই পরিবর্তনই তাঁর ক্যারিয়ারের প্রাথমিক অগ্রগতির একটি চিত্র তুলে ধরে।
প্রথম চলচ্চিত্রের পর ২০০৯ সালে মুক্তি পায় ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ‘জোনাকির আলো’, ‘তারকাঁটা’, ‘ইত্তেফাক’, ‘পদ্ম পাতার জল’, ‘অন্তর্জাল’, ‘পরাণ’ ও ‘দামাল’সহ একাধিক সিনেমায় কাজ করেছেন মিম। প্রতিটি চলচ্চিত্রে চরিত্র ও গল্পের ধরন আলাদা হওয়ায় অভিনয়ের ক্ষেত্রেও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছে তাঁর। বিশেষ করে ‘পরাণ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা পায়। বাণিজ্যিক ও দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রে কাজের পাশাপাশি অভিনয়ের বৈচিত্র্য ধরে রাখার চেষ্টাও করেছেন তিনি।
একজন অভিনয়শিল্পীর ক্যারিয়ারে জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি সেই অবস্থান ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। দর্শকের প্রত্যাশা, নির্মাতাদের চাহিদা, চলচ্চিত্রের বাজার পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া সহজ নয়। মিমের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় ধরে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। শুরুর দিকে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা একজন তরুণী থেকে তিনি এখন চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ। তাঁর অভিনয়জীবনের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক কাজ, অভিজ্ঞতা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা।
বর্তমানে মিমের পারিশ্রমিক নিয়েও বিনোদন অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। গত বছর প্রকাশিত একটি তথ্যে বলা হয়েছিল, তিনি প্রতি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ১৫ লাখ টাকার বেশি পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন। তবে এটি তাঁর বর্তমান নির্ধারিত পারিশ্রমিকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়; বিভিন্ন সময় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া একটি হিসাব। চলচ্চিত্রের বাজেট, চরিত্রের গুরুত্ব, শুটিংয়ের সময়, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এবং অন্যান্য শর্তের ওপর একজন শিল্পীর পারিশ্রমিক নির্ভর করতে পারে। তাই প্রতিটি সিনেমার ক্ষেত্রে একই অঙ্ক প্রযোজ্য হবে, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তবু পাঁচ হাজার টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি পারিশ্রমিকের এই ব্যবধান মিমের দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রথম সম্মানীর টাকা তিনি যেখানে স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন, সেখানে বর্তমান পারিশ্রমিক তাঁর পেশাগত অবস্থান ও পরিচিতির পরিবর্তনকে তুলে ধরে। একজন শিল্পীর কাছে প্রথম উপার্জনের আনন্দ অনেক সময় পরবর্তী বড় অঙ্কের অর্থের চেয়েও বেশি আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, সেই অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্বপ্ন পূরণের প্রথম স্বীকৃতি, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর অনুভূতি এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণের আনন্দ।
মিমের গল্প তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর পারিশ্রমিক বেড়ে যাওয়ার গল্প নয়; এটি বিনোদন অঙ্গনে নিজের জায়গা তৈরি করারও গল্প। লাক্স প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া, নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম সম্মানী পাওয়া, হুমায়ূন আহমেদের মতো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করা এবং পরে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়া—প্রতিটি ধাপ তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখনো তাঁর সামনে রয়েছে নতুন চরিত্রে অভিনয়, দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ এবং চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার চ্যালেঞ্জ।
অভিনয়জীবনের শুরুতে পাওয়া পাঁচ হাজার টাকা আজও যত্নে রেখে দেওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের জীবনে প্রথম অর্জনের গুরুত্ব কতটা গভীর হতে পারে। সময় বদলায়, পরিচিতি বাড়ে, আয় বাড়ে; কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। বিদ্যা সিনহা মিমের কাছে হুমায়ূন আহমেদের দেওয়া সেই প্রথম সম্মানী তেমনই এক স্মৃতি, যা তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের শুরুটিকে আজও বিশেষ করে রেখেছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত