রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে চলমান পাল্টাপাল্টি অবরোধ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে অবরোধ চলছে, অন্যদিকে সাজেক পর্যটন সড়ক সচল এবং পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। দুই পক্ষের পৃথক কর্মসূচির কারণে সাজেক সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) অবরোধের তৃতীয় দিন পার করছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের কর্মসূচি। চার দফায় ঘোষিত এই অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে বুধবার সকাল থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহন চলাচলে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষক ও শিক্ষার্থীদের কিছুটা স্বস্তি মিললেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এখনো স্বাভাবিকতা ফেরেনি।
অন্যদিকে সাজেক পর্যটন সড়ক অবিলম্বে সচল করা এবং পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধের দাবিতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, সাজেকের পর্যটন সড়কে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধের কারণে স্থানীয় পর্যটনশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে না পারায় কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির অভিযোগ, গত ১১, ১৫ ও ২২-২৩ অক্টোবর এবং সর্বশেষ ২ নভেম্বর চতুর্থ দফায় অবরোধ কর্মসূচি পালনের কারণে সাজেক পর্যটন সড়কে চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এসব অবরোধের পেছনে চিহ্নিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মদদপুষ্ট সংগঠনগুলোর ভূমিকা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাহাড়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
সাজেক বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়, মেঘ, সবুজ বনভূমি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন। স্থানীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পর্যটকবাহী যানবাহন, স্থানীয় পণ্য বিক্রি এবং বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সড়কে অবরোধ চললে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পর্যটক আসা কমে গেলে হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের আয় কমে যায়। পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত চালক, সহকারী এবং যানবাহনের মালিকেরাও আর্থিক সংকটে পড়েন। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিরা ক্রেতা হারান। বিশেষ করে যাঁরা প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার পরিচালনা করেন, তাঁদের জন্য কয়েক দিনের অবরোধও বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
পর্যটন ব্যবসার বাইরেও সাজেকের মানুষের জীবনযাত্রা সড়ক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকলে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়। পচনশীল কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারলে কৃষকেরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না। এতে শুধু কৃষকের আয় কমে না, স্থানীয় বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দামেও প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে বুধবার থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সুবিধা কতটা কার্যকর হচ্ছে, কতসংখ্যক কৃষক তাঁদের পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাচ্ছেন এবং কোন কোন পথে যানবাহন চলাচল করছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অবরোধ পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় উৎপাদকদের ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতেও অবরোধের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হলে তাঁদের নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পরীক্ষা, ব্যবহারিক ক্লাস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকার্যক্রমের সময় পরিবহন সংকট তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহন চলাচলে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই পক্ষের পৃথক অবরোধ কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে যাওয়া, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পৌঁছানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ এবং জরুরি পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। পাহাড়ি এলাকার অনেক স্থানে বিকল্প সড়ক যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে দুই পক্ষের অবরোধের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষিপ্তভাবে কর্মসূচি পালন করছেন। পরিস্থিতি যেন কোনো ধরনের সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে অবরোধের কারণে সড়ক যোগাযোগ ও সাধারণ মানুষের চলাচলে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। এক পক্ষের দাবির বিপরীতে অন্য পক্ষের কর্মসূচি দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। পর্যটন ব্যবসায়ী, কৃষক, পরিবহনশ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার মধ্যে আটকে থাকা উচিত নয়।
পাহাড়ের নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং সড়ক যোগাযোগ সচল রাখার বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দাবি ও অভিযোগ যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাহাড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতার আশঙ্কা দূর করা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা দেশের অর্থনীতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। পাল্টাপাল্টি অবরোধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং পর্যটন সড়ক স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। এখন স্থানীয় মানুষের প্রধান প্রত্যাশা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, নিরাপদে যাতায়াত করা যাবে এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও জীবিকার পথ আবার সচল হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত