গ্যাস সরবরাহ কমবে, বন্ধ হবে না: পেট্রোবাংলা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
গ্যাস সরবরাহ কমবে, বন্ধ হবে না: পেট্রোবাংলা
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ তৈরি হতে যাচ্ছে। এলএনজি সরবরাহের একটি ভাসমান টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে আজ বুধবার থেকে টানা চার দিন সারা দেশে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকতে পারে। তবে এ সময় দেশের কোথাও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না বলে গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে, যদিও সরবরাহের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পচাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে এই পরিস্থিতির সঙ্গে সাময়িকভাবে মানিয়ে নিতে হতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আগে থেকেই গ্যাসের চাপ কম থাকে, সেখানে রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজকর্মে ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ফলে প্রতিদিন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকার অভিযোগ রয়েছে। নতুন করে এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যমান সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি থেকে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। বিদেশ থেকে জাহাজে করে আনা এই গ্যাস ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই দেশের গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকাংশে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর একটি পরিচালনা করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট এলএনজি। এই টার্মিনালগুলোর মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ফলে কোনো একটি টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণ বা কারিগরি কাজ চললে সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এবার নভেম্বরের শুরুতেই সামিট এলএনজির ভাসমান টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। সাধারণত এ ধরনের কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় টার্মিনালের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখতে হয়। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হলেও এবার নভেম্বরের শুরুতে একই ধরনের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের জন্য শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির পাশাপাশি আরও দুই দিন সময় প্রয়োজন হবে। এ কারণে বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত টানা চার দিন গ্যাস সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের ফলে দৈনিক প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ এই সময় জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিকের তুলনায় কম গ্যাস যুক্ত হবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. শোয়েব জানিয়েছেন, রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ সাময়িকভাবে কম থাকবে। তবে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরবরাহের পরিমাণ কমলেও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। গ্রাহকদের মধ্যে যাতে অযথা আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য বিষয়টি পরিষ্কার করেছে পেট্রোবাংলা।

এর আগে গত ১ নভেম্বর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চার দিন গ্যাসের চাপ কম থাকার বিষয়ে গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল। তবে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, নির্ধারিত চার দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এমন তথ্যের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার কাজে পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মধ্যে সম্ভাব্য ভোগান্তি নিয়ে আলোচনা দেখা যাচ্ছে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, গ্যাসের চাপ কম থাকা এবং সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে সরবরাহের পরিমাণ কমবে, কিন্তু জাতীয় গ্রিডে গ্যাস প্রবাহ অব্যাহত থাকবে। তাই গ্যাস সরবরাহ বন্ধের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে কি না, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাস লাইনে সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে ফিরে না আসা পর্যন্ত কাজের সমাপ্তি সম্পর্কে নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত করা কঠিন। অর্থাৎ নির্ধারিত চার দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ও কারিগরি অগ্রগতির ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে।

এই অনিশ্চয়তার বিষয়টি গ্রাহকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ দীর্ঘ হলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে। তবে এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে নতুন কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। কাজের অগ্রগতি এবং সরবরাহ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশের গ্যাস সংকটের পেছনে শুধু সাময়িক রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা নয়, বরং চাহিদা ও সরবরাহের দীর্ঘদিনের ব্যবধানও বড় ভূমিকা রাখছে। প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় আগে থেকেই পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চার দিনের সাময়িক সরবরাহ হ্রাস সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে নগর এলাকার আবাসিক গ্রাহকদের জন্য রান্নার সময় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক পরিবারকে রান্নার সময় পরিবর্তন করতে হতে পারে, আবার কেউ কেউ বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতে পারেন। ছোট খাবারের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং গ্যাসনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আমদানিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো—এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় প্রয়োজন। তাই স্বল্পমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চার দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তবে পেট্রোবাংলার আশ্বাস অনুযায়ী, এ সময় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না। সাময়িক এই পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম দ্রুত ও নিরাপদে শেষ করে স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরিয়ে আনাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com