লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী সীমান্তে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে। তবে সীমান্তরক্ষী বিজিবি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে সীমান্তের সার্চলাইট বন্ধ করে অন্ধকারের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হলে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। পরে গ্রামবাসীরা দ্রুত সংগঠিত হয়ে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেন। তাঁদের সম্মিলিত উপস্থিতি ও প্রতিবাদের মুখে বিএসএফ সদস্যরা আবারও সীমান্তে আলো জ্বালাতে বাধ্য হন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাঙের বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ৮৩২-এর ২ এস সাব-পিলারসংলগ্ন এলাকায় বিএসএফের এই তৎপরতা দেখা যায় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ঘটনাটি ঘিরে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে সীমান্তের ওপারে হঠাৎ বিএসএফের সার্চলাইটের আলো নিভে যায়। সাধারণত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাতের বেলায় নজরদারির জন্য আলোকব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আলো নিভে যাওয়ার পর সীমান্তের ওপারে অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষ করেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের সন্দেহ হয়, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে লোকজন প্রবেশ করানোর চেষ্টা হতে পারে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁরা দ্রুত আশপাশের বাড়িঘরে খবর দেন।
খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা দলবদ্ধভাবে সীমান্তের দিকে এগিয়ে যান। অল্প সময়ের মধ্যে ওই এলাকায় বেশ কয়েকজন মানুষ জড়ো হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের কাছাকাছি বিএসএফ সদস্যদের টর্চলাইট জ্বালানোর চেষ্টা এবং কয়েকজনের দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায়। এ সময় বাংলাদেশের দিক থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে চিৎকার ও প্রতিবাদ জানান। তাঁদের উপস্থিতি ও প্রতিক্রিয়ার পর কিছুক্ষণ পেরিয়ে বিএসএফ সদস্যরা আবারও সার্চলাইট জ্বালিয়ে দেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেন, বোরহান উদ্দিন ও মনছুর আলীসহ কয়েকজন এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সময় থেকে ভারতে বসবাসরত বাংলাভাষী মুসলিমদের একটি অংশকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, এ ধরনের তৎপরতার কারণে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় সীমান্তে অস্বাভাবিক কোনো তৎপরতা দেখা দিলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা এমনিতেই নানা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আত্মীয়স্বজনের যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন চলাচলের ক্ষেত্রে সীমান্তের পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব রয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হলে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়। অনেক সময় রাতের বেলায় কোনো অস্বাভাবিক শব্দ, আলো কিংবা মানুষের চলাচলও তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবির পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জনগণের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তাঁরা চান, সীমান্তের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে যথাযথ যাচাই ছাড়া সীমান্ত অতিক্রম করানো কিংবা জোরপূর্বক অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে তা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এদিকে বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দিন ও রাতব্যাপী টহল কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্তে সন্দেহজনক গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্টগুলোতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে, যাতে অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা সীমান্তের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে এমন যেকোনো তৎপরতা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
তিস্তা ব্যাটালিয়ন (৬১ বিজিবি) সূত্র জানিয়েছে, সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিএসএফের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের পুশইনের চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের সীমান্তের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সব ধরনের প্রস্তুতি বজায় রেখেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সীমান্তে পুশইন বা জোরপূর্বক মানুষকে অন্য দেশে পাঠানোর অভিযোগ নতুন করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রমের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আইন, প্রচলিত প্রক্রিয়া এবং মানবিক বিবেচনা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির জাতীয়তা, পরিচয় বা নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা যথাযথ যাচাই ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। জোরপূর্বক কাউকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সীমান্তে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে শিশু, নারী, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষ রয়েছেন। হঠাৎ উত্তেজনা, নিরাপত্তা তৎপরতা কিংবা অনিশ্চিত পরিস্থিতি তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষিজমিতে কাজ করা, রাতের বেলায় জরুরি প্রয়োজনে চলাচল কিংবা জীবিকার জন্য সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। ফলে সীমান্তে নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে।
এ ধরনের ঘটনা নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় থাকা জরুরি। সীমান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে পতাকা বৈঠক, আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ কিংবা প্রচলিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ রয়েছে। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমানো এবং বড় ধরনের উত্তেজনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
বুড়িমারী সীমান্তের মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় স্থানীয়দের সতর্কতা ও বিজিবির নিরাপত্তা প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে বিএসএফের পক্ষ থেকে কী উদ্দেশ্যে ওই সময় সার্চলাইট বন্ধ রাখা হয়েছিল, সীমান্তের ওপারে ঠিক কী ধরনের তৎপরতা চলছিল এবং পুশইনের চেষ্টা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাই স্থানীয়দের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্তের নিরাপত্তা কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে আইনসম্মত ও মানবিক উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা জরুরি। বুড়িমারীসহ লালমনিরহাটের সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নজরদারি অব্যাহত রাখা, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশের অভিযোগ কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মোকাবিলা করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান করণীয়।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত