চলমান মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে জাতীয় শ্রমিক শক্তি। সংগঠনটি মনে করছে, সরকারের একের পর এক অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত, মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং শ্রমিকদের প্রত্যাশা যথাযথভাবে বিবেচনা না করার কারণেই পরিস্থিতি বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দ্রুত মেনে নিয়ে আগামী তিন দিনের মধ্যে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনে বলপ্রয়োগ, হামলা ও সহিংসতা বন্ধের দাবি জানিয়ে ব্যর্থতার দায়ে শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগও চেয়েছে তারা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় শ্রমিক শক্তির নেতারা এসব দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ। সেখানে শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের কারণ, মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়া, সরকারের ভূমিকা এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ওপর কথিত হামলার অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সরকার ও মালিকপক্ষ মজুরি বোর্ড গঠনের নামে দলীয়করণ করে নিজেদের পছন্দের লোকজনকে সেখানে স্থান দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকেরা এ ধরনের প্রক্রিয়া মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর মতে, শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণেই অসন্তোষ ক্রমে বাড়ছে। সরকারের বিভিন্ন সময়ের অপরিপক্ব সিদ্ধান্তের কারণে আন্দোলন আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিল্প খাতকে রক্ষা করতে হলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। শুধু কারখানার উৎপাদন ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনা করলেই শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ শিল্পকারখানার মূল চালিকাশক্তি শ্রমিকেরা। তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে দ্রুত মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম ফকির সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য তাঁরা আগে থেকেই মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে শ্রমমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন বলে তাঁদের অভিযোগ। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে আগামী তিন দিনের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আর দীর্ঘসূত্রতা গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সংগঠনটির সদস্যসচিব রিয়াজ মোর্শেদ শ্রমিক আন্দোলন মোকাবিলায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি শ্রমিকদের আন্দোলনে হামলা না চালানোর আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে অতীতের দমনমূলক পুলিশি আচরণের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহনশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন তাঁরা। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের নামে বলপ্রয়োগ করা হলে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় শ্রমিক শক্তির নেতারা আরও অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মী ও পুলিশের যৌথ মদদে শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। তাঁদের দাবি, শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমনের চেষ্টা করা হলে তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনের বিবরণে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, শ্রমিকদের ওপর হামলা ও দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলে সাধারণ শ্রমিকদের বর্তমান আন্দোলন আরও বৃহত্তর আকার ধারণ করতে পারে। তাঁরা মনে করেন, শ্রমিকদের ক্ষোভকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে মূল সংকটের সমাধান হবে না। বরং শ্রমিকদের দাবি, অভিযোগ এবং তাঁদের জীবনযাত্রার বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সরকারকে দ্রুত আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানান তাঁরা।
গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জাতীয় শ্রমিক শক্তির এই অবস্থান নতুন করে রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম, সড়কে যান চলাচল এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শ্রমিকদের কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর বাস্তব চাপ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের খরচ, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় মেটাতে সীমিত আয়ের শ্রমিক পরিবারগুলোকে প্রতিনিয়ত হিসাব করে চলতে হয়। মাস শেষে বেতন হাতে পাওয়ার পর অনেক শ্রমিকের পক্ষেই প্রয়োজনীয় সব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাঁদের আয়ের ওপর পরিবারের একাধিক সদস্য নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে।
শ্রমিকদের এই বাস্তবতা বিবেচনায় মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, কর্মঘণ্টা, কাজের পরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। মজুরি বোর্ডের কার্যক্রমে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করাও জরুরি।
শিল্পের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নেও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শ্রমিকেরা যদি তাঁদের পারিশ্রমিক ও কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন অসন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, অনুপস্থিতি এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে কারখানার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে শ্রমিকেরা নিজেরাই আয় হারানোর আশঙ্কায় পড়েন। তাই শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
জাতীয় শ্রমিক শক্তির পক্ষ থেকে আগামী তিন দিনের মধ্যে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করার দাবি সরকারের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করেছে। তবে মজুরি নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হওয়ায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আইনগত কাঠামো বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে অবহেলা না করে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ জন্য শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন। শ্রমিকদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল আচরণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে জাতীয় শ্রমিক শক্তির সংবাদ সম্মেলন চলমান শ্রমিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংগঠনটি একদিকে শ্রমিকদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়েছে, অন্যদিকে সরকারের কাছে তিন দিনের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের দাবি এবং শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে। এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার অগ্রগতি এবং শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সমাধানই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত