প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে হেলিকপ্টারে করে বাগেরহাটের মোংলার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর মোংলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্প্রসারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে তাঁর এ সফর। মোংলা বন্দরে নির্ধারিত অনুষ্ঠান শেষে তিনি বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। পরে সড়কপথে খুলনায় গিয়ে একটি ক্রীড়া অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে মোংলার উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। সফরসূচি অনুযায়ী, সকাল ১০টার দিকে তাঁর মোংলা বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে বিনিয়োগ ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি।
সরকারের এ সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মোংলা বন্দরে দুটি নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সমুদ্রবন্দরগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। নতুন জেটি নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্দরের পণ্য ওঠানামা ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরে দুটি কনটেইনার জেটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এর আগে সকাল ১০টায় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এবং চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। বিনিয়োগ সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ সমঝোতা স্মারককে সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মোংলা বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানি-রপ্তানির পণ্য পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এ বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুবিধা পেতে পারেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোংলা বন্দরের দুটি নতুন কনটেইনার জেটি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কনটেইনার ওঠানামা, পণ্য সংরক্ষণ এবং জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এসব সুবিধার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, দক্ষ জনবল এবং বন্দরের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগের কার্যকারিতা বৃদ্ধির ওপর।
মোংলা বন্দরের উন্নয়ন শুধু বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে। একটি কার্যকর ও আধুনিক সমুদ্রবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারকদের পণ্য পরিবহনের বিকল্প সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি বন্দরের আশপাশে গড়ে উঠতে পারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গুদাম, পরিবহনসেবা, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সহায়ক ব্যবসা। এসব কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বিশেষ করে মোংলা ও বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষের জন্য বন্দরের উন্নয়ন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিবহন, শ্রম, সরবরাহ, নিরাপত্তা, আবাসন ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে কাজের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে উন্নয়নের সুফল স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মোংলায় কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। সফরসূচি অনুযায়ী, বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে তিনি মোংলা বন্দর থেকে সড়কপথে মাজারের উদ্দেশে রওনা হবেন। দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে সেখানে পৌঁছে মাজার জিয়ারত করার কথা রয়েছে তাঁর। বাগেরহাটের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত।
মাজার জিয়ারত শেষে বেলা ১টা ১৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে তাঁর খুলনা সার্কিট হাউসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে কিছু সময় যাত্রাবিরতির পর বিকেল ৩টায় খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হচ্ছে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর দ্বিতীয় আসরের উদ্বোধন। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করা এবং তাদের নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এ আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রতিভা তুলে আনার প্রত্যাশা রয়েছে আয়োজকদের।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের আসরে অনলাইন নিবন্ধনের সংখ্যা ১৬ লাখ ২৩ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। খুলনা জেলা স্টেডিয়াম থেকে বিকেল ৩টায় প্রধানমন্ত্রী একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। ফলে এটি শুধু খুলনার একটি স্থানীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং দেশব্যাপী শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত খেলাধুলা তাদের শৃঙ্খলাবোধ, দলগত কাজের মানসিকতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করে। অনেক প্রতিভাবান শিশু আর্থিক সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব কিংবা পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় নিজেদের দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ পায় না। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু-কিশোরদেরও নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পরিচর্যা এবং প্রয়োজনীয় ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উদ্বোধনী আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ কর্মসূচি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে খুলনা নগরীতেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে কর্মসূচি ঘিরে তৎপরতা দেখা গেছে। নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও অনুষ্ঠানস্থল প্রস্তুত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বন্দর উন্নয়ন এবং শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া আয়োজনের মতো দুটি ভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি একই সফরে থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সফরে রয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। এ ছাড়া স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুস সামাদ চৌধুরী, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিকুল আলম, প্রটোকল অফিসার কামরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার সৈয়দ নাজমুল হোসেন তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে ঢাকার উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করবেন। বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাঁর অবতরণের কথা রয়েছে। অর্থাৎ মোংলা, বাগেরহাট ও খুলনার একাধিক কর্মসূচি শেষ করে একই দিন রাজধানীতে ফিরবেন তিনি।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ সহযোগিতা, ধর্মীয় ঐতিহ্য পরিদর্শন এবং শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরের নতুন জেটি নির্মাণ প্রকল্প দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্প্রসারণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার ওপর। অন্যদিকে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর দ্বিতীয় আসর সফলভাবে পরিচালিত হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নতুন ক্রীড়াপ্রতিভা উঠে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি ও সুফলের দিকে নজর থাকবে দক্ষিণাঞ্চলসহ সারাদেশের মানুষের।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত