যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর এবার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আগামী সপ্তাহেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে তাঁকে অভিশংসনের প্রস্তাবের ওপর ভোট হতে পারে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পর হেগসেথের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন রাজনীতিতে এই পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামরিক অভিযানের পরিচালনা এবং সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়া পরামর্শ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আর তৃতীয়ত, রিপাবলিকান শিবিরের একাংশ এখন নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য প্রতিরক্ষা বিভাগের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে হেগসেথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রিপাবলিকান নেতাদের একাংশের ধারণা, যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে প্রেসিডেন্টকে অতিরিক্ত আশাবাদী করে তোলা হয়েছিল। সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দ্রুত বিজয় অর্জন এবং অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার যে ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।
বিশেষ করে যুদ্ধের সুস্পষ্ট সমাপ্তির পরিকল্পনা না থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনায় যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, একটি সামরিক অভিযান শুরু করার আগে তার লক্ষ্য, সময়সীমা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা দীর্ঘায়িত হওয়ার পর এসব বিষয় নিয়ে প্রশাসনের জবাবদিহি দাবি করছেন আইনপ্রণেতারা।
এই পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসি হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, কংগ্রেসের অধিবেশন আবার শুরু হলে আগামী সপ্তাহে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাবের ওপর ভোট আয়োজনের চেষ্টা করবেন। আগামী ৯ নভেম্বর থেকে প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে অধিবেশন শুরুর পরপরই বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।
ম্যাসির এই উদ্যোগ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগেও তিনি হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় কংগ্রেসের সাংবিধানিক অনুমোদনের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি। তবে সে সময় প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করে দেওয়ায় প্রস্তাবটির ওপর ভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি কার্যত নির্বাচনের পরবর্তী সময়ের জন্য ঝুলে থাকে।
ম্যাসি মনে করছেন, এবার পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভিন্ন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর দলটির বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রিপাবলিকান প্রতিনিধি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন কিংবা আগামী মেয়াদে কংগ্রেসে থাকছেন না, তাঁরা দলীয় নেতৃত্বের চাপের বাইরে গিয়ে নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন। এ কারণে অভিশংসন প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে ধারণা করছেন তিনি।
রিপাবলিকান এই আইনপ্রণেতার প্রত্যাশা, ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থান নেবেন। পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের কিছু সদস্যও তাঁকে সমর্থন করতে পারেন। কয়েকটি রিপাবলিকান সূত্রের ধারণা, নির্বাচনের পর দলীয় অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় হেগসেথের বিরুদ্ধে প্রস্তাবটির পক্ষে প্রয়োজনীয় সমর্থন তৈরি হতে পারে। তবে ভোটের আগে কতজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে শুধু ইরান যুদ্ধকেই দায়ী করছেন না দলটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষও নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন তাঁরা। তবে এসব কারণের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের প্রভাব যে নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করছেন না রিপাবলিকান নেতাদের অনেকেই।
দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত সাধারণত একটি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হলে সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে পারে। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে প্রশাসনের ব্যাখ্যা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ায় রিপাবলিকানদের নির্বাচনী অবস্থান দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে হেগসেথের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও এখন পর্যন্ত তাঁর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন বজায় রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, হেগসেথ খুব ভালো কাজ করছেন। তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপাতত কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি ট্রাম্প। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবারও যদি একই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেতেন, তাহলেও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে নির্বাচনে রাজনৈতিক ক্ষতি হলেও সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে স্বীকার করতে রাজি নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের এই অবস্থান এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একাংশের অসন্তোষের মধ্যে হেগসেথ এখন দুই ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে প্রেসিডেন্টের আস্থা ধরে রেখে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে কংগ্রেসে তাঁর বিরুদ্ধে জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে। অভিশংসন প্রস্তাবের ভোটকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের প্রস্তাব পাস হওয়া মানেই কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে সঙ্গে পদ হারানো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের পক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এরপর বিষয়টি সিনেটে বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য পাঠানো হয়। সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করতে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস হলেও সিনেটের সিদ্ধান্ত ছাড়া হেগসেথকে পদ থেকে অপসারণ করা যাবে না।
এ ছাড়া অভিশংসন প্রস্তাবের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। এটি পাস হলে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ব, সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে প্রশাসনকে আরও কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা নীতি ও ইরান যুদ্ধের কৌশল নিয়ে কংগ্রেসে বিস্তৃত তদন্তের পথ তৈরি হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রতিরক্ষা বিভাগের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখার সুযোগও পাবেন। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, সামরিক অভিযান পরিচালনায় কী ধরনের পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়েছে, যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় কতটা বেড়েছে এবং কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির বিষয় হয়ে নেই; এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলছে। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ঘিরে যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। আগামী সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসন প্রস্তাবের ওপর ভোট হলে স্পষ্ট হবে, রিপাবলিকানদের একাংশের অসন্তোষ কতটা গভীর এবং ডেমোক্র্যাটদের নতুন রাজনৈতিক শক্তি কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। তবে ভোটের ফলাফল যা-ই হোক, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও তার পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিতর্ক যে আরও দীর্ঘায়িত হবে, তা অনেকটাই স্পষ্ট।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত