প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করার দায়ে জামালপুরে আমিনুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম এই রায় ঘোষণা করেন। এই রায়কে নারী নির্যাতন ও যৌতুক-সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আমিনুল ইসলাম জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বেনুয়ারচর এলাকার বাসিন্দা। ২০১৮ সালে পারিবারিকভাবে তার সঙ্গে বকশীগঞ্জ উপজেলার সুজানা আক্তারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে সুজানাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হত বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর কিছুদিন স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। স্বামীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র দাবি করা হয়। এসব দাবি পূরণ করতে না পারায় সুজানাকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বিষয়টি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে একাধিকবার সমঝোতার চেষ্টা হলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে জানা যায়।
ঘটনার দিন ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে আমিনুল ইসলাম তার স্ত্রী সুজানা আক্তারের পেটে লাথি মারেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরদিন ২৫ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় নিহতের বাবা একই দিনে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আমিনুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, যৌতুকের মতো সামাজিক অপরাধকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যায় না এবং নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফজলুল হক জানান, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত নিশ্চিত হয়েছেন যে, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের কারণেই সুজানা আক্তারের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, আদালত অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। একই সঙ্গে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রের অনুকূলে আদায় করা হবে।
রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত নিহতের পরিবারের সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর বিচার পাওয়ায় তারা স্বস্তি পেয়েছেন। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেন, এই রায় সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখবে।
আইনজীবীরা মনে করেন, যৌতুকের দাবিতে নারী নির্যাতন বাংলাদেশের একটি পুরনো সামাজিক সমস্যা। বিভিন্ন সময় সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে এই অপরাধ ঘটে চলেছে। তারা মনে করেন, কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের প্রবণতা কমতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যৌতুকের কারণে সহিংসতা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তারা মনে করেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যাতে নারীরা নিরাপদ পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করতে শিক্ষা ও সচেতনতার বিকল্প নেই। পাশাপাশি নারী অধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা প্রয়োজন। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই রায়কে অনেকেই একটি দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের রায় অপরাধীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান যে কঠোর, সেটিও এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।