টাইব্রেকারে ইতালির স্বপ্নভঙ্গ, বিশ্বকাপে ফেরার আশা শেষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪২ বার
ইতালির বিশ্বকাপ স্বপ্নভঙ্গ টাইব্রেকার হার

প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল ইতালির জন্য আরেকটি হতাশার রাত। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ইতিহাসে এমন দুঃসময়ের অধ্যায় খুব কমই দেখা গেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসার দীর্ঘ প্রতীক্ষা আরও দীর্ঘ হলো, কারণ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে প্লে-অফ ফাইনালে টাইব্রেকারে ৪-১ ব্যবধানে হেরে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে ইতালি। এই পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হারার গল্প নয়, বরং একটি ফুটবল জাতির ভেঙে পড়া স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।

জেনিৎসার বিলিনো পোলি স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনায় ভরপুর। ম্যাচের শুরুতে ইতালির খেলায় ছিল দৃঢ়তা, ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। প্রথমার্ধের ১৫ মিনিটেই ফরোয়ার্ড ময়েস কিনের পা থেকে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। সেই গোল যেন ইতালির দীর্ঘ ১২ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটানোর স্বপ্নকে নতুন করে উজ্জীবিত করে তোলে। ইতালির সমর্থকরা তখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, অবশেষে তাদের দল আবার বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে ফিরতে যাচ্ছে।

কিন্তু ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে সব হিসাব-নিকাশ। প্রথমার্ধের শেষদিকে ঘটে সেই নাটকীয় ঘটনা, যা পুরো ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। ৪২ মিনিটে ডিফেন্ডার আলেসান্দ্রো বাস্তোনি সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ইতালি পড়ে যায় বড় ধরনের বিপাকে। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর থেকেই ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে তারা। এই একটি সিদ্ধান্ত যেন ইতালির ভাগ্যকেই বদলে দেয়।

দ্বিতীয়ার্ধে একজন বেশি খেলোয়াড় থাকার সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে শুরু করে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। তারা একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে ইতালির রক্ষণভাগে। ইতালির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি ডোনারুম্মা অসাধারণ কিছু সেভ করে দলকে বারবার বিপদ থেকে রক্ষা করেন। তার দৃঢ়তা না থাকলে হয়তো ম্যাচটি নির্ধারিত সময়েই ইতালির হাতছাড়া হয়ে যেত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি একাই সবকিছু ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি।

ম্যাচের ৮২ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত সমতা। বসনিয়ার অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড এডিন জেকোর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আক্রমণ থেকে গোল পায় স্বাগতিকরা। সেই গোল যেন পুরো স্টেডিয়ামে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। অন্যদিকে ইতালির খেলোয়াড়দের মুখে তখন স্পষ্ট হতাশার ছাপ। এত কষ্ট করে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের শেষদিকে এসে সমতা হারানো ছিল তাদের জন্য বড় ধাক্কা।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ সমতা থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও দুই দলই চেষ্টা চালিয়ে যায়, কিন্তু কেউই আর গোলের দেখা পায়নি। ক্লান্তি, চাপ আর স্নায়ুচাপে ভর করে পুরো ম্যাচ চলে যায় টাইব্রেকারে—যেখানে ভাগ্যই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় নির্ধারক।

টাইব্রেকারে শুরু থেকেই এগিয়ে যায় বসনিয়া। তাদের প্রথম শটেই গোল করেন বেঞ্জামিন তাহিরোভিচ। বিপরীতে ইতালির প্রথম শটটি মিস করেন পিও এস্পোসিতো। এরপর থেকে ইতালির খেলোয়াড়রা আর নিজেদের ছন্দে ফিরতে পারেননি। ব্রায়ান ক্রিস্টান্তের শট মিস করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বসনিয়ার খেলোয়াড়রা ছিল আত্মবিশ্বাসী এবং নির্ভুল। শেষ পর্যন্ত ৪-১ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা।

এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইতালির ফুটবল ইতিহাসে যুক্ত হলো আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। একসময় যারা বিশ্ব ফুটবল শাসন করত, সেই দলটিই এখন টানা তিনটি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে অনুপস্থিত থাকার পর এবারও একই পরিণতি—এটি নিঃসন্দেহে ইতালিয়ান ফুটবলের জন্য গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইতালির এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। দল গঠনে ধারাবাহিকতার অভাব, তরুণ খেলোয়াড়দের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারা, এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মানসিক দৃঢ়তার ঘাটতি—সব মিলিয়ে বড় ম্যাচে বারবার হোঁচট খাচ্ছে আজ্জুরিরা। এছাড়া লাল কার্ডের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তাদের ম্যাচ পরিকল্পনাকে ভেঙে দেয়।

অন্যদিকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জন্য এটি এক ঐতিহাসিক সাফল্য। কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন নাটকীয় জয় তাদের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তারা প্রমাণ করেছে, দলগত প্রচেষ্টা এবং মানসিক দৃঢ়তা থাকলে বড় দলকেও হারানো সম্ভব।

এই ম্যাচটি শুধু একটি ফলাফল নয়, বরং ফুটবলের অনিশ্চয়তা ও নাটকীয়তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ইতালির জন্য এটি আত্মসমালোচনার সময়, নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার সময়। অন্যদিকে বসনিয়ার জন্য এটি স্বপ্নপূরণের এক নতুন অধ্যায়।

বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ইতালির মতো একটি দলের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে বড় শূন্যতা তৈরি করবে। কিন্তু ফুটবল থেমে থাকে না। নতুন দল, নতুন গল্প আর নতুন ইতিহাস নিয়েই এগিয়ে চলে এই খেলা। ইতালির সমর্থকরা এখন অপেক্ষায় থাকবেন, কবে তাদের প্রিয় দল আবার ফিরে আসবে সেই মহামঞ্চে—যেখানে একসময় তারা ছিল রাজত্বের প্রতীক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত