ইরান উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০ বার
বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দেওয়ার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই লাফিয়ে বেড়েছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারের উপরে উঠে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় উল্লম্ফন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের বাজার বরাবরই ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সংঘাত বা উত্তেজনার যে কোনো ইঙ্গিতই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের আশঙ্কা তৈরি করে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দামে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইরানকে কেন্দ্র করে যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এই সময়ের মধ্যে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে বলে জানা গেছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ব্যয়ের চাপ বাড়ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশই এখন বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চাপে পড়েছে।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, কৃষি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ প্রায় সব খাতে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য নতুন নীতিমালা গ্রহণ করতে শুরু করেছে। কোথাও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হচ্ছে, আবার কোথাও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে স্বল্প সময়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার ফলে আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যেখানে জ্বালানির বড় একটি অংশ আমদানি করতে হয়, সেখানে এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি খরচ বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, যা শিল্পখাতে প্রভাব ফেলে এবং প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

এদিকে তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি এই পথ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দামের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনিশ্চয়তা। সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তাহলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি বড় কোনো সরবরাহ বিঘ্ন না ঘটে এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হয়, তাহলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সে সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক দেশ এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এর সুফল পাওয়া সম্ভব নয়, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং এর প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বে। তেলের বাজারে অস্থিরতা তারই একটি প্রতিফলন। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত