প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে মস্তিষ্ক অন্যতম, যা সচল থাকার জন্য প্রধানত গ্লুকোজ বা রক্তে থাকা শর্করার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মস্তিষ্ক নিজে গ্লুকোজ তৈরি বা সংরক্ষণ করতে পারে না। ফলে রক্তে সুগারের মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় হাইপোগ্লাইসেমিয়া।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতি হলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এতে স্নায়বিক সংকেত এলোমেলো হয়ে যেতে পারে, যার ফলে রোগীর মাথা ঘোরা, খিঁচুনি, এমনকি অচেতন হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘ সময় এ অবস্থায় থাকলে মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকিও থেকে যায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগী, নবজাতক শিশু, লিভার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমকারী মানুষের ক্ষেত্রে হঠাৎ ব্লাড সুগার কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
হাইপোগ্লাইসেমিয়ার অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, শরীর কাঁপা এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া। অনেক সময় রোগী হঠাৎ মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও অস্থিরতা অনুভব করেন। কেউ কেউ প্রচণ্ড ক্ষুধা অনুভব করেন বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। চোখে ঝাপসা দেখা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং খিটখিটে মেজাজও এই অবস্থার লক্ষণ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে চোখের অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এন্ডোক্রিনোলজিস্টদের মতে, এই সমস্যার পেছনে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যে ভারসাম্য না থাকা। বিশেষ করে যারা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে ভুল মাত্রায় ইনসুলিন গ্রহণ বা ইনসুলিন নেওয়ার পর পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়ার কারণে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।
দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা, অতিরিক্ত ব্যায়াম বা শারীরিক শ্রম, এবং খালি পেটে মদ্যপানও রক্তে সুগার দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দৈনন্দিন খাদ্য পরিকল্পনা না মেনে চলার কারণে এই সমস্যার শিকার হন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হঠাৎ সুগার কমে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক অবস্থায় রোগীকে দ্রুত গ্লুকোজ দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণত তিন চা-চামচ গ্লুকোজ পাউডার পানিতে মিশিয়ে বা ফলের রস খাওয়ানো হলে দ্রুত রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
গ্লুকোজ গ্রহণের প্রায় ১৫ মিনিট পর রক্তে সুগার পুনরায় পরীক্ষা করা উচিত। যদি অবস্থার উন্নতি না হয়, তবে একই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে। তবে রোগী যদি অচেতন হয়ে যান বা মুখে খাবার গ্রহণ করতে অক্ষম হন, তাহলে কোনোভাবেই খাবার বা পানীয় খাওয়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই একমাত্র নিরাপদ পদক্ষেপ।
চিকিৎসকদের মতে, হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত খাবার গ্রহণ, ওষুধ সঠিক মাত্রায় নেওয়া এবং শারীরিক কার্যকলাপের সঙ্গে খাদ্য গ্রহণের ভারসাম্য বজায় রাখা। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্তে সুগার পরীক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, অনেক সময় সাধারণ দুর্বলতা ভেবে মানুষ হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ উপেক্ষা করেন, যা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
হঠাৎ ব্লাড সুগার কমে যাওয়া একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি, যা সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা না নিলে প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সঠিক জীবনযাপন এই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, হাইপোগ্লাইসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা জানা থাকলে অনেক জটিল পরিস্থিতি সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব।