প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বেগুনি রঙের বিদেশি সবজি বিটরুট এখন আর শুধু সালাদের একটি উপাদান নয়, বরং আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে একে ধরা হচ্ছে একটি “প্রাকৃতিক সুপারফুড” হিসেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত খাদ্যতালিকায় বিটরুট রাখলে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ানো—সব ক্ষেত্রেই এই সবজির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
বিটরুট মূলত এক ধরনের মূলজাতীয় সবজি, যার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় এটি শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, তখনকার মানুষ বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতা কমাতে নিয়মিত বিটরুট খেতেন, যা আধুনিক গবেষণাতেও অনেকাংশে প্রমাণিত হচ্ছে।
এই সবজির অন্যতম প্রধান শক্তি এর পুষ্টিগুণে। বিটরুটে রয়েছে ফোলেট, ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম, আয়রন এবং ভিটামিন সি-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব উপাদান শরীরের কোষ গঠন, রক্ত উৎপাদন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে আয়রন রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে কার্যকর, যা অনেক মানুষের সাধারণ একটি সমস্যা।
পুষ্টিবিদদের মতে, বিটরুট শুধু সরাসরি খাওয়া নয়, বরং এর রসও অত্যন্ত উপকারী। বিটরুটের রসে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন বি-৬ এবং নাইট্রেট থাকে, যা রক্তনালী প্রসারিত করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি একটি প্রাকৃতিক সহায়ক খাদ্য হতে পারে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও বিটরুট হজমশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। এতে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। যারা দীর্ঘদিন ধরে হজমজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাদের খাদ্যতালিকায় বিটরুট যুক্ত করা উপকারী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
চোখের স্বাস্থ্য রক্ষাতেও বিটরুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে থাকা ভিটামিন এ এবং ক্যারোটিন রেটিনার কার্যকারিতা বাড়ায় এবং দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে বয়সজনিত চোখের সমস্যা কমাতে এটি সহায়ক বলে মনে করা হয়।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করার ক্ষেত্রেও বিটরুটের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এতে থাকা ফোলেট মস্তিষ্কের কোষের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বিটেইন ও ট্রিপটোফ্যান নামক উপাদান মানসিক চাপ কমাতে এবং মন ভালো রাখতে সহায়তা করে। এ কারণে মানসিক অবসাদ বা দুশ্চিন্তায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য বিটরুটকে একটি প্রাকৃতিক সহায়ক খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিটরুটে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রাকৃতিক নাইট্রেট শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। কিছু গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিয়মিত বিটরুট গ্রহণ ক্যানসার প্রতিরোধের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। যদিও এটি এখনো সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত নয়, তবে প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক।
অ্যাথলেটদের মধ্যেও বিটরুটের ব্যবহার বাড়ছে। কারণ এটি রক্তে অক্সিজেন প্রবাহ উন্নত করে, যা শারীরিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। অনেক ক্রীড়াবিদ প্রতিযোগিতার আগে বিটরুট জুস পান করেন শক্তি ধরে রাখার জন্য।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, সব মানুষের জন্য বিটরুট সমানভাবে উপযোগী নয়। যাদের রক্তচাপ খুব কম, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই, গলব্লাডারে পাথর রয়েছে বা অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে বিটরুট বা এর রস গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অতিরিক্ত গ্রহণ কিছু ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে।
বিটরুট রান্না করে, সালাদ হিসেবে বা জুস আকারে খাওয়া যায়। অনেকে আবার এটি স্মুদি বা বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর পানীয়েও ব্যবহার করেন। এর স্বাদ কিছুটা মিষ্টি ও মাটির মতো হওয়ায় অনেকের কাছে এটি আকর্ষণীয় লাগে।
পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে বিটরুট রাখা শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে আধুনিক জীবনযাত্রায় যেখানে মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বেড়ে গেছে, সেখানে বিটরুট একটি সহজলভ্য ও প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যসমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ছোট এই বেগুনি সবজিটির ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য স্বাস্থ্যগুণ, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে শরীর ও মন দুই-ই উপকৃত হতে পারে। নিয়মিত ও পরিমিত গ্রহণই এর সর্বোচ্চ উপকার পাওয়ার মূল চাবিকাঠি।