সুপ্রিম কোর্টের স্বকীয়তা নিয়ে প্রশ্ন আইনমন্ত্রীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০ বার
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি বলেছেন, দেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিগত সরকারের সময়ে এটি অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পড়ে যায়।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) যশোর জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব মন্তব্য করেন। সভায় স্থানীয় আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগ একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর একটি হলেও বিগত সময়ে এই প্রতিষ্ঠানকে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, এতে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার বিচার ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগ সচিবালয় আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম কমিশন আইন এবং জুলাই সনদ আইন উল্লেখযোগ্য। তবে এসব আইন চূড়ান্ত করার আগে বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আইনমন্ত্রী দাবি করেন, জনগণ এমন কোনো বিচার ব্যবস্থা চায় না যেখানে অনৈতিকতা বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকে। তিনি বলেন, বিচার ব্যবস্থায় “ইন্টেলেকচুয়াল দুর্নীতি” রোধ করতে সরকার কাজ করছে, যাতে আইনের শাসন আরও শক্তিশালী হয়।

মানবাধিকার কমিশন এবং গুম কমিশন নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু নীতিমালায় অস্পষ্টতা থাকায় সেগুলো নিয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই সনদের কিছু অংশ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী তা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

বক্তব্যে আইনমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকেও ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রে বিভক্তির রাজনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, যা দেশের জন্য শুভ নয়। তার মতে, ১৯৭১ বা ২০২৪ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভাজন সৃষ্টি না করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

তিনি বলেন, বিভক্তির রাজনীতি থেকে সরে এসে একটি “বাংলাদেশি চেতনা” গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তার মতে, দেশের স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা অপরিহার্য।

আইনমন্ত্রী আরও দাবি করেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্রসফায়ার, গুম এবং মিথ্যা মামলার মতো অভিযোগ অনেকাংশে কমে এসেছে। তবে এই বক্তব্যের বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক মহলে।

যশোরের ঐতিহ্যবাহী আদালত ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আইনজীবীদের জন্য কল্যাণমূলক ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন, যেখানে মৃত্যুর পর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

সভায় উপস্থিত অন্যান্য অতিথিরা বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন, আইনজীবীদের কল্যাণ এবং বিচারপ্রাপ্তির গতি বাড়ানোর বিষয়ে মতামত দেন। তারা বলেন, দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আইন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করবে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা নিয়ে তার মন্তব্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে অনেকেই মনে করছেন, বিচার বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ও জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

সব মিলিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য বিচার ব্যবস্থা সংস্কার, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ আইন কাঠামো নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনা বাস্তবে কোনো নীতিগত পরিবর্তনের দিকে এগোয় কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত